প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

৩১ প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয়ে হতো আরেকটি পদ্মা সেতু

সিপিডির সংলাপে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে মেয়াদ ও সময় বৃদ্ধি একটি নিয়মিত কাজে পরিণত হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩১টি প্রকল্প সংশোধনের ফলে অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে ২৯ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা, যা পদ্মা সেতুর খরচের সমান। বারবার সংশোধন ও সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার ফলেই এই ব্যয় বেড়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সংগঠন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সংলাপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। তাছাড়া দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক অভিজ্ঞ প্রকল্প পরিচালক তৈরি হয়নি বলেও আলোচনায় উঠে আসে। প্রকল্প পরিচালকদের ঢাকায় অবস্থান করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রকল্পের দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

রাজধানীর একটি হোটেল গতকাল ‘বাংলাদেশে সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন: অর্থের যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় সংলাপে অংশ নেন জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি উপাধ্যক্ষ মো. আব্দুস শহীদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান ও পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ। সিপিডি ও দি এশিয়ান ফাউন্ডেশন যৌথভাবে সংলাপের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপনায় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে দেখা যায়, বারবার প্রকল্প সংশোধন হয়। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কাল বেড়ে যায়। আর সময় বৃদ্ধি মানেই ব্যয় বৃদ্ধি। আমরা মেগা প্রকল্প ও ছোটখাটো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে, সেখানে এক হাজার ৩৫৬টি প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নেয়া হয়েছে।  এর মধ্যে কারিগরি সহায়তার প্রকল্পগুলো বাদ দিলে থাকে এক হাজার ২৫০টি প্রকল্প। এগুলো সুশানের সঙ্গে সময়মতো সাশ্রয়ীভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের জন্য মঙ্গল হবে।

তিনি বলেন, এসডিজি বাস্তাবায়নের সঙ্গে ৭২ শতাংশ অবকাঠামো কাজ জড়িত। তাই একটি কাঠামোর মাধ্যমে অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়া প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোও ওএডিসি কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করে থাকে। এ কাঠামোতে ১০ মূল ভিত্তি ও ৪৭টি সূচক নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তারা প্রকল্প পরিবীক্ষণ কাজে নিয়োজিত সরকারি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতি জোর দেন। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সংস্থাটির ৩৩৮টি পদের মধ্যে ১২৩টি পদই খালি রয়েছে। তাই বর্তমান সময়ের সঙ্গে প্রকল্পের আকার যেভাবে বেড়েছে, সেভাবে মনিটরিং কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়। এ সময় অনেকে উল্লেখ করেন, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ইকোনমিক ক্যাডারকে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত করা ঠিক হয়নি। এতে করে প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ ও বাস্তবায়ন কাজে দক্ষ জনবলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে বক্তারা মত দেন।

এ সময় পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি ইকোনমিক ক্যাডার বিলুপ্তির পক্ষে ছিলাম না। কিন্তু ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারাই প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত হওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলেন।’ তিনি বলেন, প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হচ্ছেন প্রকল্প পরিচালক। কিন্তু দেখা যায়, পঞ্চগড়ের কোনো প্রকল্পের পরিচালক ঢাকায় থাকছেন, এটা জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্ম এলাকায় কেউ থাকতে চাচ্ছেন না। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীকে পাওয়া যায় না; তাদের নাটাই ঢাকায়, কিন্তু সুতা কাটা যাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের অনেক বিধি অপ্রয়োজনীয়। ব্রিটিশ, পাকিস্তানি ও সামরিক শাসকেরা এসব করেছেন, যার এখন বাস্তবতা নেই। কিন্তু অনেক দুষ্ট আমলা এসব বিধান চতুরভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ আছে এসব বদলানোর বিষয়ে। তা সত্ত্বেও এসব পরিবর্তন করা যাচ্ছে না, নানা প্রতিবন্ধকতা এসে হাজির হয়। তবে আইনকে আইন দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে। আমরা সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকারের পিপিপি প্রকল্পে ব্যক্তি খাতের প্রতিনিধিত্ব নেই। জাতীয় অবকাঠামো রোডম্যাপ প্রস্তুত করার আহ্বান জানান তিনি। যারা সময়মতো কাজ করে না, তারাই পরে আবার ভালো প্রকল্প পায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

মাশরুর রিয়াজ বলেন, ২০০৯ সাল থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশে ৬০৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। সেক্ষত্রে প্রতি বছর ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। তবে আমাদের দেশে খুব দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। তাছাড়া সঠিক তথ্য ছাড়া প্রকল্পের হিসাব-নিকাশ করা হয়। ফলে কর্মপরিকল্পনা ও কেনাকাটায় দুর্বলতা থেকে যায়।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ বলেন, কর্মকর্তাদের সরকারি অর্থে কেনা ব্যক্তিগত গাড়ি থাকার পরও প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা একটি দামি জিপ গাড়ি কেনেন। সঙ্গে দুটো মোটরসাইকেলও কেনেন। এগুলোকে চুরি বলব না, তবে আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেকেই দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন।

প্রকল্প প্রণয়নের সময় প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই বা কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস হচ্ছে না বলে আক্ষেপ করেন সংসদ সদস্য এনামুল হক। তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় মানুষের যাপিত জীবনের পরিবর্তনের বিষয়টি আমলে নেয়া হচ্ছে না।