আসাদুজ্জামান রাসেল, রাজশাহী : রাজশাহী নগরীর লক্ষ্মীপুরের প্যারামেডিকেল সংলগ্ন টিবি পুকুর এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে ২০০ শয্যার একটি আধুনিক শিশু হাসপাতালের ভবন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে চিকিৎসাসেবার এক বিশাল পরিসর গড়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে এটি যেন নিথর দালান। দুই বছর আগে নির্মাণকাজ শেষ হলেও হাসপাতাল এখনও চালু হয়নি।
জানা গেছে, হাসপাতালটি নির্মাণ এবং কার্যক্রম চালুর জন্য তা সঠিকভাবে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বুঝে নিতে হবে এবং বুঝিয়ে দিতে হবে, কিন্তু প্রকল্পের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন ভিন্ন ভিন্ন কথা। তারা একে অন্যের এবং সবশেষ মন্ত্রণালয় দিকে তাকিয়ে আছেন। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি এই হাসপাতাল আজ অযত্নে-অবহেলায় ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হয়ে পড়ছে এসি, দামি ফ্রিজসহ যন্ত্রপাতি, উঠতে শুরু করেছে দেয়ালের রং। অথচ সম্প্রতি হাসপাতালের আসবাবপত্র কেনার জন্য নতুন করে ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে দখলচেষ্টার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচার সরকার পতনের পর, স্থানীয় একটি বাহিনী ভবনটি দখলের চেষ্টা করলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বাধা দেন। এ সময় ঠিকাদারের পাহারাদার নজরুল ইসলাম মারধরের শিকার হন।
নজরুল ইসলাম জানান, আমি শুরু থেকে হাসপাতাল পাহারা দিচ্ছি। কিন্তু এত বড় ভবন একা সামলানো যায় না। রাতের আঁধারে জানালার ফ্রেম খুলে নিচ্ছে চোররা। হাসপাতাল কার্যক্রম শুরু হলে এগুলো ঘটত না। প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালের জুনে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত রোগীর চাপ কমাতে এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা দেয়ার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে প্রকল্প অনুমোদন হয়েছিল। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জনবল নিয়োগ করেনি, ফলে হাসপাতাল কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না স্বাস্থ্য বিভাগ।
এ বিষয়ে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হায়াত মুহাম্মদ শাকিউল আজম জানান, আমরা সিভিল সার্জন কার্যালয়কে হাসপাতাল বুঝে নিতে বার বার অনুরোধ করেছি। কিন্তু জনবল না থাকায় তারা নিতে পারছে না। ফলে যন্ত্রপাতি পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম. রাজিউল করিম জানান, তিনি নতুন দায়িত্বে এসেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেয়া হলেও হাসপাতাল চালুর কোনো নির্দেশনা আসেনি। জনবল নিয়োগের বাইরে হাসপাতালটি কীভাবে চালু হবে সে নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা মন্ত্রণালয় থেকে আসেনি। তাই আমরা ভবনটি বুঝে নিতে পারছি না। তবে আসবাবপত্র কেনার জন্য ৮ কোটির একটি বরাদ্দ চলতি মাসেই হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রাজশাহী জেলার সভাপতি আহমেদ শফিউদ্দিন জানান, শিশু রোগীদের চাপ কমাতে নতুন হাসপাতাল নির্মাণ ছিল সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গাফিলতির কারণে যদি হাসপাতাল চালু না হয়, তাহলে এটি জনগণের অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। দ্রুত জনবল নিয়োগ দিয়ে হাসপাতাল চালু করা জরুরি।
এই শিশু হাসপাতালটি চালু হলে উত্তরাঞ্চলের অসংখ্য শিশু রোগী চিকিৎসার সুযোগ পাবে। কিন্তু জনবল সংকট আর প্রশাসনিক জটিলতায় ভবনটি এখন ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে, আর কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি হয়ে পড়ছে অকেজো। এখন প্রশ্ন একটাইÑসরকার কি দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে হাসপাতালটি চালু করবে, নাকি আরও কয়েক বছর কেটে যাবে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post