প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

৩৬ বছরেও লাভের মুখ দেখেনি রংপুর চিনিকল

বগুড়া প্রতিনিধি: সুুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে ৩৬ বছরেও লাভের মুখ দেখেনি রাষ্ট্রায়ত্ত রংপুর সুগার মিল। তারপরও ই-সেবায় ও ডিজিটাইজড পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হয়ে আজ শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে গাইবান্ধা জেলার একমাত্র ভারী শিল্প-কারখানা মহিমাগঞ্জের রংপুর সুগার মিলের ৬০তম আখ মাড়াই মৌসুম।

১৯৫৪-৫৫ সালে জার্মানি কারিগরি সহায়তায় গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে ৭০ একর জমির ওপরে গড়ে তোলা হয় এ চিনিকল। ১৯৫৭ সালে বাণিজ্যিকভাবে রংপুর সুগার মিল প্রথম উৎপাদনে যায়। এর পর থেকেই মিলটি দেশের অন্যতম মিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিন্তু আশির দশকের পর থেকে আখের উৎপাদন কমে যাওয়ায় শুরু হয় লোকসানের পালা। আশি দশকের পর প্রতিবছর ঢাকঢোল পিটিয়ে আখ মাড়াই শুরু হলেও তা লোকসানের অঙ্ক বাড়ানো ছাড়া কোনো কাজেই আসেনি।

রংপুর চিনিকলের আওতায় মহিমাগঞ্জের আখচাষি আনারুল ইসলাম ও রেজাউল করিম জানান, আখ একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল। আখ চাষাবাদ করতে যে সময় লাগে তাতে অন্য ফসল তিন-চারটি ঘরে তোলা যায়। মিল থেকে যে টাকা দেওয়া হয় তাতে উৎপাদন খরচ উঠে না। তারপরও সে টাকা নিতে অনেক ঝামেলা। আখ চাষ না করে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষাবাদ করলে স্বল্প সময়ে অনেক লাভবান হওয়া যায়।

রংপুর চিনিকলের এক কর্মচারী জানান, আশি দশকের আগে প্রতিবছর আখ চাষ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু আশি দশকের পর ৮৪ সালে সারা দেশে বড় ধরনের বন্যা হওয়ার পর আখ এ এলাকায় ধীরে ধীরে আখ চাষ কমতে শুরু করে। বর্তমানে যে আখ এলাকায় উৎপাদন হয় তাতে এক মাস মিল চালানোই কঠিন। কাঁচামাল সংকটে মিলের অবস্থা শোচনীয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিলের একাধিক শ্রমিক জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে এ মিলের লোকসানের বোঝা প্রতিবছরই বেড়েই চলেছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনাই তারা নেননি। কৃষকদের সময়মতো আখের মূল্য পরিশোধ না করায় তারা আখ চাষ থেকে বিমুখ হচ্ছেন। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আখ চাষে উৎসাহ হারাচ্ছেন কৃষকরা। এতে কাঁচামাল সংকটে আবার অনেক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চিনিকলের উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে।

এদিকে পূর্জি ব্যবস্থাপনা ও আখের মূল্য পরিশোধের সনাতন পদ্ধতিকে বদলে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ও ডিজিটাইজড পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হয়ে আজ শুক্রবার শুরু হচ্ছে গাইবান্ধা জেলার কৃষিভিত্তিক একমাত্র ভারী শিল্প-কারখানা মহিমাগঞ্জের রংপুর চিনিকলের ৬০তম আখ মাড়াই মৌসুম। ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি ও গাইবান্ধা-৪ গোবিন্দগঞ্জ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ বিকাল ৪টায় ডোঙ্গায় আখ নিক্ষেপণের মাধ্যমে ২০১৬-১৭ আখ মাড়াই মৌসুমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। এ উপলক্ষে চিনিকল কেইন কেরিয়ার প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। চলতি মাড়াই মৌসুমে ৪৫ দিনে চার হাজার ৪০০ একর জমি থেকে সংগ্রহ করা ৬০ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে দুই হাজার ৯০০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চিনি আহরণের হার শতকরা ৬ দশমিক ৫ ভাগ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আখচাষিদের দীর্ঘদিনের সমস্যা পূর্জিপ্রাপ্তি ও আখের মূল্যপ্রাপ্তির অনিয়ম এবং দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটাতে এ মৌসুম থেকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করা হয়েছে এ দুটির ব্যবস্থাকে। কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই আখচাষিরা এবার থেকে ঘরে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ই-পূর্জি ও মোবাইল ব্যাংকিং পদ্ধতিতে আখের মূল্য পেয়ে যাবেন।

রংপুর সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আউয়াল জানান, চলতি মৌসুমে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ মিলটির চার হাজার ৫০০ একর জমির আখ চাষ করা হয়েছে। এতে ৬০ হাজার হেক্টর আখ উৎপাদন হবে, যা দিয়ে ৪০-৪৫ দিন মিলটি চালু রাখা যাবে। এতে তিন হাজার ৯০০ টন চিনি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত অর্থবছরের তিন হাজার ৮০০ একর জমিতে আখ চাষাবাদ হয়েছিল, ১৫-১৬ দিন মিল চালু ছিল। মিলটির লাভ-ক্ষতির প্রশ্নের উত্তরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, এসব প্রতিষ্ঠান লাভজনক খুব কম হয়। তারপরও রংপুর চিনিকল লাভজনক প্রতিষ্ঠানে ফেরানোর জন্য নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।