প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

৩৭ দিনে ২৫০ কোটি টাকা দেবে গ্রামীণফোন ও রবি

সমঝোতার পথে মোবাইল ফোন অপারেটর-বিটিআরসি

রহমত রহমান ও হামিদুর রহমান: দেনদরবার উপেক্ষা করে অবশেষে অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সমঝোতার পথে দেশের শীর্ষ দুই মোবাইল ফোন অপারেটর ও বিটিআরসি। আগামী ৩৭ দিনের মধ্যে গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটা পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) ২৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ‘গ্রামীণফোন ও রবির কাছে অডিটে উদ্ভূত সরকারি পাওনার বিষয়টির সম্মানজনক সুরাহা’ বিষয়ে গত ৩ অক্টোবর সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী, এনবিআর চেয়ারম্যান, গ্রামীণফোন, রবি ও বিটিআরসি প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় দুই অপারেটর ও বিটিআরসির বকেয়া পাওনা বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে পাঁচটি প্রস্তাব তোলা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে পাওনা বিষয়ে বিটিআরসি, গ্রামীণফোন ও রবি উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মাধ্যমে একটি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি আলোচনার মাধ্যমে স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারি পাওনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে; অথবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পদ্ধতি বের করবে। সে পদ্ধতিতে দুই মোবাইল ফোন কোম্পানি বিটিআরসিকে অর্থ পরিশোধ করবে।
সে পদ্ধতি কেমন হবে এ বিষয়ে সভায় উপস্থিত থাকা এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, একটি অডিট ফার্ম দিয়ে বিটিআরসির আগের অডিটগুলো পুনঃনিরীক্ষার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এতে দুই অপারেটর ও বিটিআরসি রাজি হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রস্তাবনায় বলা হয়, গ্রামীণফোন ও রবি ব্যবসা পরিচালনার সুবিধার্থে বিটিআরসি শোকজসহ সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা অনতিবিলম্বে প্রত্যাহর করবে এবং একইভাবে মোবাইল ফোন অপারেটরদ্বয় ও বিটিআরসি যৌথভাবে সব মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নেবে। তৃতীয় প্রস্তাবে বলা হয়, অর্থমন্ত্রী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী, এনবিআর চেয়ারম্যান এবং বিটিআরসি চেয়ারম্যান প্রত্যক্ষভাবে কমিটির কার্যক্রম মনিটর করবেন। চতুর্থ প্রস্তাবে বলা হয়, এ কমিটি গঠন ও কমিটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে আগামী সাত দিনের মধ্যে গ্রামীণফোন ১০০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আরও ১০০ কোটি টাকা বিটিআরসির অনুকূলে জমা দেবে। একইভাবে রবি আজিয়াটা কমিটির কার্যক্রম শুরুর আগে আগামী সাত দিনের মধ্যে ২৫ কোটি টাকা এবং পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আরও ২৫ কোটি টাকা বিটিআরসির অনুকূলে পরিশোধ করবে।
শেষের প্রস্তাবে বলা হয়, চারটি প্রস্তাব উভয় মোবাইল ফোন অপারেটর তাদের কর্তৃপক্ষের কাছে পর্যালোচনা ও অনুমোদনের জন্য অবিলম্বে উপস্থাপন করবে। এছাড়া এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে।
এ বিষয়ে গ্রামীণফোন লিমিটেডের হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ও অ্যাকটিং হেড অব কমিউনিকেশনস হোসেন শাদাত শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের অমীমাংসিত ও ভিত্তিহীন অডিট দাবির জটিলতা নিরসন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার প্রয়াসে আমরা অর্থমন্ত্রী, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। সাম্প্রতিক গঠনমূলক আলোচনাগুলোর ওপর ভিত্তি করে আমরা একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্বচ্ছ সমাধানের উদ্দেশ্যে আলোচনার অগ্রগতিতে কিছু দিকনির্দেশনার সুপারিশ করেছি। সুপারিশগুলো সরকারের বিবেচনাধীন ছিল এবং গত বৃহস্পতিবারের আলোচনায় উভয় অপারেটরকেই একটি পাল্টা প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা আমরা এখন খতিয়ে দেখছি। আমাদের লাইসেনস বাতিলসংক্রান্ত বিটিআরসির ভিত্তিহীন শোকজ নোটিস যেহেতু তুলে নেওয়া হয়নি, সেহেতু আমরা আমাদের প্রত্যুত্তর দাখিল করেছি।’
আজিয়াটার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাইনি। এখনও বিষয়টি আলোচনাধীন। কোনো ধরনের সিদ্ধান্তে গেলে জানানো হবে।’
সূত্র জানায়, ১৮ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সভা শেষে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে গ্রামীণফোন ও রবির কাছে সরকারের রাজস্ব এবং বিটিআরসির পাওনার বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে। পাওনার বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তবে এ পাওনা আদায়ের বিষয়টি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি করা হবে। আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যেই একটি ন্দর সমাধান হবে। আমরা নিজেরা হারব না, কাউকে হারাবও না। অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ ও রবি ২২ বছর ধরে নিয়মিতভাবে ভ্যাট, ট্যাক্স ও বিটিআরসির পাওনা পরিশোধ করে আসছিল। এর মধ্যে বিভিন্নভাবে গ্রামীণফোনের কাছে চার থেকে সাড়ে চার হাজার ও রবির কাছে ৮০০ থেকে সাড়ে ৮০০ কোটি টাকার দাবি আছে। এ দুটি অপারেটরের কাছে আবার বিটিআরসির পাওনা সুদসহ আট হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, রাজস্ব বাবদ গ্রামীণফোনের কাছে যে চার হাজার কোটি টাকা পাওনা, তা এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তির অপেক্ষা আছে। আর বিটিআরসির যে পাওনা, তা আলোচনার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হবে। আমরা মনে করি, আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানে আসা উচিত। অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ৩ অক্টোবর সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বিটিআরসির নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রামীণফোনের কাছে ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে সরকারের। অন্যদিকে রবিকে পরিশোধ করতে হবে ৮৬৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। গ্রামীণফোনের বকেয়ার মধ্যে আট হাজার ৪৯৪ কোটি এক লাখ টাকা পাবে বিটিআরসি আর এনবিআর পাবে চার হাজার ৮৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করায় সরকারি নির্দেশনামতে গত ৪ জুলাই বিটিআরসি গ্রামীণফোনের ৩০ শতাংশ ও রবির ১৫ শতাংশ ব্যান্ডউইড্থ ব্লক করে রাখে।

 

সর্বশেষ..