প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

৩ বছর লোকসানে: আজিজ পাইপসের দর তবুও বাড়ছে

পলাশ শরিফ: গত তিন বছর লোকসান দিচ্ছে পুঁজিবাজারে ‘জেড’ ক্যাটাগরির তালিকাভুক্ত আজিজ পাইপস। এদিকে তিন বছর ধরে লোকসান দিলেও কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিচ্ছে না প্রায় দুই দশক। তারপরও এর শেয়ারদর বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির কারণে গত দুই বছরে কোম্পানিটিকে পাঁচ দফা কারণ দর্শাও নোটিস দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। যতবারই নোটিস দেওয়া হয়েছে, ততবারই কোম্পানির পক্ষ থেকে ‘কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই’ বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে বেড়েই চলেছে কোম্পানিটির শেয়ারদর।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ২০১৪ সাল থেকে টানা তিন বছর ধরে লোকসানে প্রকৌশল খাতের কোম্পানি আজিজ পাইপস। তবে কোম্পানিটির শেয়ারদরে লোকসানের ছাপ নেই। ঝুঁকিপূর্ণ মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) সত্ত্বেও দুই বছরে এর শেয়ারদর ৩৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। গত এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর প্রায় ৩১ টাকা ৮০ পয়সা বেড়েছে। কোম্পানিটির এ সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধিকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে মনে করে গত মাসে দরবৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়েছে ডিএসই। তবে এ দরবৃদ্ধির পেছনে ‘অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই’ বলে জানিয়েছে আজিজ পাইপস।

আজিজ পাইপসের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী কোম্পানি সচিব এএইচএম জাকারিয়া শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ব্যাংক ঋণের কারণে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে না পারা ও চলতি মূলধন সংকটের কারণে কোম্পানিটির উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করা যায়নি। সর্বশেষ অর্থবছরে উৎপাদনক্ষমতার

মাত্র ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ ব্যবহার করতে

পেরেছি। চলতি মূলধন সংকটের কারণেই কোম্পানিটি দুরবস্থায় পড়েছে। আর পুঞ্জীভূত লোকসানের কারণেই বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। তবে ঋণ পরিশোধ ও চলতি মূলধন জটিলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য এরই মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই আমরা লোকসান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো।’

এদিকে আজিজ পাইপসের ‘অস্বাভাবিক’ দরবৃদ্ধির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত এক বছরে ‘জেড’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানিটির শেয়ারদর ২৭ টাকা ২০ পয়সা বা ৫২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে। গতকাল কোম্পানিটির দর আগের দিনের তুলনায় প্রায় এক দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়ে ডিএসইতে প্রতিটি শেয়ার ৯৮ টাকায় সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালের ১০ জুলাই কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ার ৫০ টাকা ২০ পয়সায় লেনদেন হয়েছিলো। আর দুই বছর আগে ২০১৫ সালের ৬ জুলাই কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ২১ টাকা। আর এ সময় অস্বাভাবিকভাবে শেয়ারদর বৃদ্ধির কারণে পাঁচ দফায় নোটিস পাঠিয়েছে ডিএসই। প্রত্যেকটি নোটিসের জবাবে ‘দরবৃদ্ধির পেছনে অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই’ বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

জানা যায়, চলতি মূলধনের অভাব, পুঞ্জীভূত লোকসান, ঋণের বোঝা ও দায় পরিশোধে সক্ষমতা না থাকা, পণ্যের বাজার কমে আসা এবং কাঁচামাল সংকটের কারণে কয়েকটি ইউনিটের উপাদন বন্ধ থাকার কারণে ধুঁকছে আজিজ পাইপস। ১৯৮৬ সালে তালিকাভুক্ত স্বল্প মূলধনি কোম্পানিটি ২০১৩ সালে সর্বশেষ ছয় লাখ আট হাজার টাকা মুনাফা করেছিলো। এরপর থেকেই লোকসান গুনছে আজিজ পাইপস। ২০১৬ সালের জুন শেষ হওয়া সমাপ্ত অর্থবছরের ১৮ মাসে তিন কোটি ত্রিশ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে। এর মধ্য দিয়ে কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ৪১ কোটি ৮৪ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ওই আর্থিক বছরে আজিজ পাইপসের শেয়ারপ্রতি লোকসান তিন টাকা ৮২ পয়সা ছিল। আর লভ্যাংশ না দিয়ে প্রায় দুই দশক ধরে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে কোম্পানিটি। আয় কমার বিপরীতে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির কারণে কোম্পানিটির পিই রেশিও বর্তমানে ১৯৮ দশমিক ২৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৬ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়া আর্থিক বছরের ১৮ মাসে কোম্পানিটির আয় ৭৩ লাখ ৫৬ হাজার ১৮ টাকা বেড়ে ১২ কোটি ৫৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আয় বাড়ার কারণে ১২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা পরিচালন মুনাফাও করেছিলো কোম্পানিটি। কিন্তু প্রাক-উৎপাদন খরচ সমন্বয়ের কারণে লোকসানে পড়েছে কোম্পানিটি। ওই আর্থিক বছরে এক কোটি ৫৯ লাখ টাকা কর-পরবর্তী লোকসান হয়েছে। যে কারণে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান এক টাকা ৬০ পয়সা ও শেয়ারপ্রতি দায় ৫৯ টাকা ২০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। তবে চলতি ২০১৬-১৭ আর্থিক বছরের নয় মাসের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে ১৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা আয় ও প্রায় ১৮ লাখ ২০ হাজার টাকা পরিচালন মুনাফা দেখিয়েছে আজিজ পাইপস।

এদিকে সর্বশেষ তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি দুই লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৬ সালে সর্বশেষ ৫০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি। এরপর থেকে প্রায় দুই দশক লভ্যাংশ দিচ্ছে না কোম্পানিটি।

উল্লেখ্য, স্বল্প মূলধনি ওই কোম্পানির মোট ৪৮ লাখ ৫০ হাজার শেয়ারের ৩৬ দশমিক ৭৬ শতাংশই উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে রয়েছে। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে পাঁচ দশমিক ৫১ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের  হাতে ৫৭ দশমিক  ৭৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

 

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..