মত-বিশ্লেষণ সুশিক্ষা

৪২ বছরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আতিক এম রহমান: শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বহু কৃতী পুরুষের স্মৃতিবিজড়িত ভূমি কুষ্টিয়া। ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর এ জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ জেলার মধ্যবর্তী দুটি গ্রাম শান্তিডাঙা ও দুলালপুরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ এই বিদ্যাপিঠের। স্বাধীন বাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়টি এ বছর ৪২ বছরে পদার্পণ করল।

দেশের গণমানুষের চাহিদা পূরণে তৎকালীন সরকার ১৯৭৬ সালের ১ ডিসেম্বর ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। পরে ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে উচ্চশিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ১৯৮০ সালের ২৭ ডিসেম্বর ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট, ১৯৮০ (৩৭)’ পাস হয়। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমানে ১৭৫ একর ভূমির ওপর আটটি অনুষদ, ৩৪টি বিভাগ, একটি ইনস্টিটিউট ও একটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থী এবং ৪৫০ শিক্ষক নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ধর্মতত্ত্ব অনুষদের অধীনে ডিগ্রি প্রদান ছাড়াও নৈসর্গিক সুন্দর ক্যাম্পাসের জন্য পরিচিতি রয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের। কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়কের পাশে গড়ে তোলা ক্যাম্পাসের দৃষ্টিনন্দন প্রধান ফটক হয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব’। সেটির ডানে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘মুক্ত বাংলা’ আর বাঁয়ে সততার স্মারক ‘সততা ফোয়ারা’। পাশেই রয়েছে ভাষাশহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার আর স্বাধীনতাযুদ্ধসহ অন্যান্য শহীদের স্মরণে নির্মিত ‘স্মৃতিসৌধ’। ম্যুরাল পেরিয়ে পা বাড়াতেই বিস্তৃত সবুজে ঘেরা ‘ডায়না চত্বর’। ‘ক্যাম্পাসের প্রাণ’ এই চত্বরটি শিক্ষার্থীদের আড্ডায় মুখর থাকে দিনরাত। ডায়না থেকে বাঁ দিকে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল, আর ডানে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ডরমিটরি। এ দুয়ের মাঝেই একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন। ক্যাম্পাসের পশ্চিম কোনায় ছাত্রীদের হল ঘেঁষে বয়ে গেছে মনোরম ‘লেক’।

দীর্ঘ সময় পেরিয়ে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব কষতে গেলে প্রত্যাশার পাওনা এখনও ঢের বাকি। কালের বিবর্তনে একসময়কার সেশনজটের জাঁতাকলে পিষ্ট বিভাগগুলোয় কিছুটা গতিশীলতা এসেছে। বাঙালি জাতির রক্তাক্ত ইতিহাসের সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা হিসেবে গ্রন্থাগারে চালু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, একুশ ও বঙ্গবন্ধু কর্নার। বেড়েছে অবকাঠামো উন্নয়ন। ৫৩৭ কোটি টাকার মেগাপ্রকল্পে ৯টি ১০ তলা ভবনসহ ১৯টি ভবনের ঊর্ধমুখী সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করা হলে স্বপ্নের অনেকটাই পূর্ণতা পাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। এই দিনটি প্রতিবার নানা উৎসব-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে কভিড মহামারির কারণে এবার সেই আনুষ্ঠিকতা অনেকটাই নিষ্প্রভ। তবু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থেমে নেই সেই আনন্দ-উল্লাস। ক্যাম্পাসের লোগো-সংবলিত বিভিন্ন রঙের ফ্রেমে নিজেদের প্রোফাইল ছবি আবদ্ধ করছেন নবীন ও সাবেক শিক্ষার্থীরা, স্মৃতিচারণা করে প্রকাশ করছেন অনুভূতি।

আমাদের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গুণগত শিক্ষা ও মৌলিক গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেবে। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মশালার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ ও যোগ্য ব্যক্তিদের পদায়ন করা হবে। শিক্ষামূলক জার্নাল প্রকাশ নিয়মিতকরণ, মৌলিক প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ এবং সেখানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রয়াসে বিশ্ববিদ্যালয়কে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনন্দক্ষণে সবার জন্য শুভ কামনা।

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..