প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

৪৫ বছরে ৩৫ গুণ দেশের অর্থনীতি

ইসমাইল আলী: কয়েক বছর আগেও মনে করা হতো বাংলাদেশের অর্থনীতি হয়তো উন্নতি করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় হয়তো এগিয়ে যেতে পারবে না বাংলাদেশ। আর কয়েক দশক আগে মনে করা হতো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের উদাহরণ হবে বাংলাদেশ। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের নেতিবাচক তকমাও জুটেছিল বাংলাদেশের কপালে। অথচ ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। পাঁচ শতাংশের বেশি হারে গত এক দশকে বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্র এখন বাংলাদেশ। নানা সাফল্যের গল্পও করা হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঘিরে।
মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম বৃহৎ অর্থনীতি। চলতি মূল্যে এ অবস্থান ৪৫তম। অথচ ১৯৭২ সালে এ অবস্থা ধারণার মধ্যেই ছিল না। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর অর্থাৎ ২০১৬ সালে কেমন হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোর কত কাছে থাকবে বাংলাদেশ, কতটা এগোবে বাংলাদেশ এ নিয়ে সে সময় পূর্বাভাস ছিল অকল্পনীয়।
যদিও সে অসম্ভবকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২১ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ ৪৫ বছরে জিডিপির আকার ৩৫ গুণ বড় হয়েছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের অর্থনীতির এ অর্জনকে বিস্ময়কর বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। শেয়ার বিজকে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ বা ’৭৩ সালে কল্পনাই করা যেত না ৪৫ বছর পর বাংলাদেশ কোথায় থাকবে। নানা ধরনের আশঙ্কাও করা হয়েছিল সে সময়। তবে সব ধরনের আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে আজকের অবস্থানে এসেছে বাংলাদেশ। এখন সাফল্যের বিভিন্ন ধরনের উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশকে তুলনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে কোনো ধরনের অবকাঠামো ছিল না। বড় কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও ছিল না। শিক্ষার হার ছিল অনেক কম। দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় শতভাগ। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো অবশ্যই অনেক চ্যালেঞ্জের। আর সেটা খুব ভালোভাবেই মোকাবিলা করেছে বাংলাদেশ।
বহুজাতিক এ দাতা সংস্থাটির তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর প্রথম তিন বছর বাংলাদেশের জিডিপির আকার মোটামুটি দ্রুত বাড়ে। মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিনিয়োগ করায় এটি অর্জন সম্ভব হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের জিডিপির আকার দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৪৪৮ বিলিয়ন ডলার। এরপর দুই বছর তা কমে ১০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে এর জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ১৯৭৮ সাল থেকে আবার জিডিপির আকার বাড়তে শুরু করে। ১৯৮১ সালে তা ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৮২ ও ’৮৩ সালে আবার জিডিপির আকার হ্রাস পায়। এরপর থেকে নিয়মিতই বাড়ছে জিডিপি। তবে গতি ছিল কিছুটা মন্থর। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের জিডিপির আকার দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। আর ২০০০ সালে এর আকার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার।
২০০২ সালের পর থেকে জিডিপির আকার দ্রুত বাড়তে শুরু করে। সে বছর এর পরিমাণ ছিল ৫৪ দশমিক ৭২৪ বিলিয়ন ডলার। ২০০৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১ দশমিক ৮১৯ বিলিয়ন ডলারে। ২০০৯ সালে জিডিপির আকার ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। আর মাত্র সাত বছরের মধ্যে তা দ্বিগুণের বেশি বাড়ে। ২০১৬ সালে জিডিপির আকার ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থানের পেছনে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন ড. জাহিদ হোসেন। প্রথমটি ছিল কৃষিতে সবুজ বিপ্লব। দ্বিতীয়টি নীরব শিল্প বিপ্লব। পাশাপাশি শিল্পকে সহায়তা করতে সেবা খাতও প্রসারিত হয়েছে।
কৃষির সাফল্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কৃষি ছিল মূলত প্রকৃতিনির্ভর। শুষ্ক মৌসুমে কোনো ফসল হতো না। অনাবৃষ্টিতে কোনো কোনো বছর দুর্ভিক্ষের আশঙ্কাও জেগে বসতো। এখন দেশের প্রায় সব জমি তিন ফসলিতে রূপান্তরিত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমেও ফসল ফলছে। প্রতি বছর আবাদি জমি হ্রাস ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরও চালে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ, ১৯৭২ সালে যা ছিল সম্পূর্ণ অকল্পনীয়।
বাংলাদেশের শিল্প খাতের সাফল্যকে ব্রিটেনের প্রথম শিল্প বিপ্লবের সাফল্যের চেয়েও বড় বলে মনে করে ড. জাহিদ হোসেন। এর কারণ ব্যাখ্যায় দুই দেশের জিডিপিতে শিল্পের অবদান তুলনা করে তিনি বলেন, ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ সালে ব্রিটেনে প্রথম শিল্প বিপ্লব হয়। ওই সময় অর্থাৎ ৮০ বছরে দেশটিতে শিল্প খাতের অবদান বেড়েছিল ১১ শতাংশ। এর মধ্যে ১৭৬০ সালে ব্রিটেনের জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ২০ শতাংশ। ১৮৪০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ শতাংশে। আর ৪৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান বেড়েছে ২৮ শতাংশ। এক্ষেত্রে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে শিল্পের অবদান ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশ। এটা অবশ্যই শিল্প বিপ্লব।
অর্থনীতির এ গতিকে আরও উপরে তুলে ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ। তবে এ পথে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্বাধীনতার ৭০ বছরের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে দুটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রথমত, ৮-১০ শতাংশ হারে ১৫-২০ বছর প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধির সুফলকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলেই এ লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে বলে মনে করেন তারা।