বাণিজ্য সংবাদ

৪৮ বছরেও ব্যবসাবান্ধব শহর হয়ে ওঠেনি চট্টগ্রাম

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দেশের শিল্প-বাণিজ্যের জন্য প্রধান গুরুত্বপূর্ণ শহর চট্টগ্রাম। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হওয়ায় চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছে একাধিক ইস্পাত, সিমেন্ট, জাহাজনির্মাণ, জাহাজভাঙা, এলপিজি প্লান্ট, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি এ শহরে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের বসবাস। এ শহরকে সবার জন্য বাসযোগ্য, ব্যবসাবান্ধব ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন করার জন্য সরকারি সেবাপ্রদানকারী ৩২টির বেশি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা স্বাধীনতার পর থেকে কাজ করছে। কিন্তু সংস্থাগুলো গত ৪৮ বছরে চট্টগ্রামকে পুরোপুরি বাসযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় এ বাণিজ্য নগরটি। কিংবা কয়েক ঘণ্টার যানজটে স্থবির হয়ে পড়ে বাণিজ্যিক কর্মচাঞ্চল্য।
সূত্রে জানা যায়, দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর চট্টগ্রাম। আর এ শহরে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর অবস্থিত। স্বাধীনতার ৪৮ বছরে বেসরকারি উদ্যোগে একে একে গড়ে উঠেছে ভারী শিল্পখ্যাত ইস্পাত, সিমেন্ট, তেল পরিশোধন কেন্দ্র, জাহাজনির্মাণ, জাহাজভাঙা, এলপিজি প্লান্ট, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি রয়েছে ভোগ্যপণ্য আমদানির একাধিক পাইকারি বাজারও। আর এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আছে ২৫ লাখ কোটি টাকারও বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে ১৫ লাখেরও বেশি। অপরদিকে এ শহরকে বাসযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব করার জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিয়তার লক্ষ্যে সরকারি সেবাপ্রদানকারী ৩২টির বেশি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কাজ করছে। গত ৪৮ বছরে এসব সংস্থা নানা ধরনের উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। পাশাপাশি কয়েক হাজার কোটি টাকার বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলমান আছে। তবে এসব আয়োজন সত্ত্বেও এখনও পুরোপুরি বাসযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব শহর হিসেবে চট্টগ্রাম গড়ে উঠতে পারেনি। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় চট্টগ্রাম। আর প্রধান সড়কের বিকল্প সড়ক হয়নি, বেড়েছে যানজট এবং পরিবহন খাতে নৈরাজ্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ প্রভৃতি প্রকট হয়ে উঠছে নগরজীবনে। পাশাপাশি একই কারণে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক আমদানি-রফতানি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতিও স্থবির হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, স্বাভাবিক সময়ে বন্দর ইয়ার্ড থেকে গড়ে আট হাজার কনটেইনার ডেলিভারি হয়। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারি চার হাজার টিইইউসেরও কম হয়। অথচ ঘূর্ণিঝড় ফণীর পর গত ৬ মে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৬০০ টিইইউ’স কনটেইনার ও কার্গো ডেলিভারি হয়। রমজানে গত ১২ জুলাই চার হাজার ৮০০ টিইইউ’স কনটেইনার ডেলিভারি হয়।
আসাদগঞ্জ, চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ এলাকার আমদানিকারকরা বলেন, চট্টগ্রামে ব্যবসা করি আর ছোট ঋণের জন্য হেড অফিসের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। অথবা আমদানির জন্য অনুমোদনপত্রের জন্য যেতে হয় ঢাকায়। এটা কি সম্ভব? এছাড়া সময়মতো পণ্য বুঝে পাওয়া কিংবা সরবরাহ দেওয়া তো খুব কঠিন। অথচ সময়মতো ব্যাংক ঋণসহ অন্যান্য খরচ পরিশোধ করতে হয়। আর দিন শেষে লোকসান গুনে বাড়ি যেতে হয় আমাদের। এভাবে ব্যবসা করা যায়? এতে উন্নয়নের সুফল কোথায়?
চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি একটি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০০৭ সাল থেকে আগ্রাবাদ এলাকায় বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করি। তখন লোডশেডিং হতো দৈনিক ছয় থেকে আট ঘণ্টার মতো। ডিজেলচালিত জেনারেটর চলত দৈনিক ছয় থেকে আট ঘণ্টা। এতে মাসে ১৩০-১৫০ লিটার ডিজেল লাগত। আর ২০১৯ সালেও এ দুর্বিষহ অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। এত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরও কেন আগ্রাবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় এমন লোডশেডিং এখনও আছে? এখনও মাসিক ১৫০ লিটার তেল খরচ করে জ্বালানি চাহিদা মেটাতে হচ্ছে? এটা কি কোনো উদ্দ্যেশমূলক বিষয়, নাকি সংকট?
বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সড়কে স্থাপিত অফডক কনটেইনার ইয়ার্ডগুলোর জন্য কার্যত ওই এলাকার জনগণের জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে। এ অফডক ইয়ার্ডগুলোর ভারী যানবাহন তথা কনটেইনার লরি, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের কারণে বিমানবন্দর সড়কটি প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবরুদ্ধ হয়ে থাকে। এসব অফডক নিয়ে বন্দর ও রাজস্ব বোর্ডের সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগান্তিতে আছে নগরবাসী ও ব্যবসায়ীরা। ফলে অফডক ও ইয়ার্ডকেন্দ্রিক যানজটের কারণে বিদেশি নাগরিকরা চট্টগ্রামে আসতে অনীহা প্রকাশ করে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে চট্টগ্রাম ব্যবসাশূন্য নগরে পরিণত হবে, যার প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে।
পোশাক ব্যবসায়ী অঞ্জন শেখর দাশ বলেন, প্রায় আড়াই লাখ শ্রমিক ইপিজেডে কর্মরত রয়েছে, যাদের যানজটের কারণে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এছাড়া সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারার কারণে শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে লোকসান গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, অতিবৃষ্টি, যানজট ও জলজটের কারণে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিমানবন্দর থেকে মূল শহর পর্যন্ত মাত্র ১৬ কিলোমিটার সড়ক পেরোতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লাগে। ফলে অনেক বিদেশি ক্রেতা কার্যাদেশ না দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নগরের ওপর চাপ কমিয়ে বন্দরের গতিশীলতা বজায় রাখতে অতিসত্বর বে-টার্মিনাল এলাকায় ডেলিভারি ইয়ার্ড ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ ফার্স্ট ট্র্যাক প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় সরকারের লক্ষ্য অর্জনে চরম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ বলেন, বাণিজ্যিক রাজধানী-খ্যাত চট্টগ্রাম নগর যেভাবে গড়ে ওঠা দরকার ছিল, ঠিক সেভাবে গড়ে ওঠেনি। একটি শহরে যাতায়াতের জন্য প্রধান সড়কের পাশাপাশি দু-তিনটি বিকল্প সড়ক থাকা দরকার, কিন্তু চট্টগ্রামে শুধু একটিই প্রধান সড়ক। বিকল্প সড়ক সেভাবে নির্মিত হয়নি, যে কারণে বন্দরকেন্দ্রিক যানজট হচ্ছে। তিনি বলেন, বে-টার্মিনালে ডেলিভারি ইয়ার্ড ও অত্যাধুনিক ট্রাক টার্মিনাল নির্মিত হবে। ফলে চট্টগ্রাম শহরে ট্রাকের যে যানজট, সেটা আর হবে না। এছাড়া বন্দরের অর্থায়নে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে। এর ফলে সরাসরি মূল সড়ক বাদ দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে বন্দরগামী গাড়িগুলো বন্দরে চলাচল করতে পারবে। ফলে জনদুর্ভোগ লাঘব হবে। এছাড়া চালু করা হবে ওয়াটার বাস বা প্যাসেঞ্জার শিপ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..