৫০ বছরে অর্জন অনেক অপ্রাপ্তিও আছে

বিআইডিএসের বার্ষিক সম্মেলনে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অধিকাংশ সূচকে পাকিস্তানকে এবং বেশকিছু সূচকে ভারতকে  পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ১৯৯০ সালের পর থেকে ব্যাপক হারে দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। তবে এ সময়ে সমাজে বৈষম্যও বেড়েছে। সামাজিক অগ্রগতিতে অবদান রেখেছে পোশাক শিল্পের অগ্রগতি, দারিদ্র্য নিরসন, কর্মক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি এবং দ্রুত নগরায়ণ। সেই সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোক্তার বিকাশ এদেশকে এগিয়ে নিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এনজিওগুলোর ক্ষুদ্রঋণ এবং সামাজিক কার্যক্রম। তবে অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া নানারকম ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক উন্নয়ন সম্মেলন ২০২১ উদ্বোধন হয়েছে গতকাল। দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদরা এ বক্তব্য তুলে ধরেন। রাজধানীর লেকশোর হোটেলে তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলন শুরু হয়েছে। এতে ‘বাংলাদেশ ইন কমপারেটিভ পারসপেক্টিভ’ প্রতিবেদন তুলে ধরেন সংস্থাটির মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন। আরও অন্যান্য বিষয়ে প্রথম দিনে  প্রায় ১০টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। বক্তব্য দেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম এবং পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক ডেপুটি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম। এছাড়া বিভিন্ন অধিবেশনে বক্তব্য দেন সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন, আলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এসআর ওসমানি প্রমুখ।

ড. বিনায়ক সেন তার প্রতিবেদনে বলেন, ভারতের তামিলনাড়ু, কর্নাটক, কেরেলা যেভাবে এগিয়ে গেছে উত্তর প্রদেশ ও বিহার সেইভাবে এগিয়ে যায়নি। এছাড়া দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলও ব্যাপক বৈষম্যের শিকার। এখানে ব্যাপক আঞ্চলিক বৈষম্য বিরাজমান। ভারতের উত্তর আর দক্ষিণে ভ্রমণ করলে মনে হবে এটি যেন ভিন্ন দুটি দেশ। আবার পাকিস্তানের পাঞ্জাবে বা ইসলামাবাদে যে উন্নয়ন হয়েছে সেইভাবে বেলুচিস্তান বা সিন্ধু প্রদেশে হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে এমন ব্যাপক মাত্রার আঞ্চলিক বৈষম্য নেই। দেশ স্বাধীনের আগে যেমন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য ছিল, এখন সে রকম নেই। তবে কুড়িগ্রামের দারিদ্র্য আর নারায়ণগঞ্জের দারিদ্র্য এক নয়। এটা হয়েছে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে। যেমন নদী ভাঙা, উপকূলীয় অবস্থান, হাওর এবং পাহাড়ি অঞ্চলে যেভাবে উন্নয়ন হওয়ার কথা সেভাবে হয়নি। অবস্থান এবং প্রাকৃতিক কারণেই এটা করাটাও কঠিন।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাথাপিছু আয়ে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ এবং  ভারতের কাছাকাছি গেছে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ হারে বাড়ত অথচ এখন (২০১০ সালের হিসাব) এটা ৫ দশমিক ০৩ শতাংশ হারে বাড়ছে। ১৯৯০ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় ৩ দশমিক ২৬ হারে বাড়ত, এখন কমে ১ দশমিক ১৪ হার হয়েছে। একইভাবে নব্বই দশকে পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ, এটা এখন আরও কমে শূন্য দশমিক ৮৬ হয়েছে। অথচ মাথাপিছু আয়ে ৯০ দশকে পাকিস্তানের চেয়ে ৪৫ শতাংশ পিছিয়ে ছিল  বাংলাদেশ। এখন পাকিস্তানের চেয়ে মাথাপিছু আয়ে ১০ শতাংশ এগিয়ে বাংলাদেশ।

এছাড়া উৎপাদন খাতে ভারত-পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নব্বই দশকে এ খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি ছিল ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ, যা এখন হয়েছে ১৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ।  অথচ উৎপাদন খাতে প্রতিনিয়ত পিছিয়ে যাচ্ছে ভারত-পাকিস্তান। একই সময়ে ভারতে উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল  ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ, অথচ এখন কমে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। একইভাবে উৎপাদন খাতে পাকিস্তান পিছিয়ে যাচ্ছে। ৯০ দশকে এ খাতে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ, এখন কমে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। নগরায়ণেও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ৯০ দশকে বাংলাদেশের নগরায়ণ হার ছিল ১৯ দশমিক ৮১ শতাংশ, এখন বেড়ে হয়েছে ৩৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। ভারতে একই সময়ে নগরায়ণের হার ছিল ২৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ, এখন  দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। পাকিস্তানের নগরায়ণে ৯০ দশকে হার ছিল ৩০ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা এখন হয়েছে ৩৭ দশমিক ১৭ শতাংশ।

ভারত-পাকিস্তানকে বাংলাদেশ পেছনে ফেলার অন্যতম কারণ, কর্মসংস্থানে নারীর উপস্থিতি বেড়েছে। নব্বই দশকে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানে নারী উপস্থিতির হার ছিল ২৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ অথচ এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। একই সময়ে ভারতে নারীর উপস্থিতি ছিল ৩০ দশমিক ২৭ শতাংশ অথচ এখন কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অন্যদিকে নব্বই দশকে পাকিস্তানে কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি ছিল ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ। এখন দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। তবুও বাংলাদেশের সমান হতে পারেনি।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন,  কমিউনিটি ক্লিনিক, হাওর উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন-সংক্রান্ত প্রকল্পে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। এসব কারণে বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ যেসব প্রকল্প সমাজ ও দেশকে গিয়ে নেবে সেগুলোকে ঢেলে উপরে দিচ্ছি। বিআইডিএস স্বাধীনভাবে কাজ করবে। কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না।

ড. মসিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। জাতির জনকের কন্যার হাত ধরে তার নেতৃত্বে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশের আজকের উন্নয়ন বঙ্গবন্ধু সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফসল। কেননা দেশ স্বাধীনের পরপরই তিনি পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেছেন, দ্রুত অর্থনৈতিক  উন্নয়নের পথ খুঁজেছেন। সেই সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে।

রেহমান সোবহান বলেন, পোশাক খাতের হাত ধরে বাংলাদেশ অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা এক্ষেত্রে সফল ভূমিকা পালন করেছেন। গত ৪০ বছরে ওষুধ, চামড়া, শিপবিল্ডিং ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্প বিকাশ লাভ করেছে। রপ্তানি ক্ষেত্রে বহুমুখীকরণ করতে হবে। গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাকসহ এনজিওগুলো ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে  উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা করেছে। সেই সঙ্গে সামাজিক ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে। তবে আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তির উন্নয়ন ক্ষেত্রে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকবিলা করা।

অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বলেন, দেশের দারিদ্র্য নিরসনে অগ্রগতি হলেও বৈষম্য বেড়েছে। দেশ থেকে টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয় খেয়াল রাখতে হবে।

ড. জাহিদ হোসেন তার গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেন, করোনা মহামারি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিয়েছে।  বিনিয়োগ ও বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি করোনার আগের  তুলনায় কমেছে।  অব্যাহতভাবে চলতি হিসেবে ঘাটতি আছে। তারপরও রিজার্ভ বাড়ছে। তবে আইএমএফের মতে, রিজার্ভের হিসাবে গরমিল রয়েছে। বৈদেশিক ঋণ বিষয়ে তেমন ঝুঁকি নেই। তবে ঋণ নিয়ে ভোগবিলাসে ব্যয় করা যাবে না। উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করতে হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা  বহিঃস্থ ঝুঁকি তৈরি করেছে। বাজেট-সংক্রান্ত ঝুঁকি রয়েছে। ভ্যাকসিন সরবরাহে  বাজেট সহায়তা কমছে। এছাড়া বৈদেশিক অর্থায়নপুষ্ট মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় বাড়ছে। এটাও ঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবে  অর্থনীতিতে সম্ভাব্য উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি করোনা মহামারি থেকে পুনরুদ্ধার হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ভোগের কারণে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯১৬২  জন  

সর্বশেষ..