Print Date & Time : 20 May 2022 Friday 1:35 am

৬৭% ব্যয় বাড়লেও ডাবল লাইন হচ্ছে না চাষাঢ়া-নারায়ণগঞ্জ অংশ

ইসমাইল আলী: ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প নেয়া হয় ২০১৫ সালে। বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের পাশে ডুয়েলগেজ নতুন একটি লাইন নির্মাণ করার কথা ছিল প্রকল্পটির আওতায়। তবে প্রায় চার বছর পর প্রকল্পটিতে ভুল ধরা পড়ে। এজন্য প্রকল্পটি সংশোধন করা হচ্ছে। এতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে ৬৭ শতাংশ। এর পরও চাষাঢ়া থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রধান রেলস্টেশন নৌবন্দর  এলাকা পর্যন্ত দুই কিলোমিটার অংশ ডাবল লাইন করা হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ খুবই ব্যস্ততম রুট। অনেকেই নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা এসে লেখাপড়া বা চাকরি করছেন। এতে রুটটিতে আগামীতে ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। অথচ জমি অধিগ্রহণের জটিলতা এড়াতে চাষাঢ়া-নারায়ণগঞ্জ অংশটি ডাবল লাইন না করা সম্পূর্ণ ভুল পদক্ষেপ। তাই রেলওয়ের উচিত এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা।

তথ্যমতে, ২০১৫ সালের ২০ জানুয়ারি ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরাল একটি ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ’ প্রকল্পটি অনুমোদন করে একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি)। সে সময় প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ৩৭৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাপানের অনুদান রয়েছে ২৪৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বাকি ১২৯ কোটি ১১ লাখ টাকা সরকারের তহবিল থেকে সররবাহ করা হবে।

সংশোধিত হিসাবে প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৩২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ রেলপথটির নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে ২৫৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা বা ৬৭ দশমিক ১১ শতাংশ। তবে প্রকল্পটিতে বাড়তি কোনো অর্থ দিতে রাজি নয় জাপান সরকার। ফলে ব্যয় বৃদ্ধির পুরোটাই সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করতে হবে।

সম্প্রতি প্রকল্পটির সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (আরডিপিপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি আওতায় বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরালে একটি ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণকাজ চলছে। নতুন ডুয়েলগেজ লাইনটি বিদ্যমান রেললাইনের চেয়ে অনেক উঁচু। এতে বিদ্যমান স্ট্রাকচারে অসম ভার্টিকাল লেভেল দেখা দেবে। ফলে স্টেশন, সেতু, প্ল্যাটফর্ম ও লেভেল ক্রসিংয়ে জটিলতা বাড়বে। ফলে ট্রেন চলাচলে জটিলতা সৃষ্টি হবে। আবার লেভেল ক্রসিংগুলোয় সাধারণ যানবাহন চলাচলেও সমস্যা সৃষ্টি হবে।

এ সমস্যা পরিহারে নতুন একটি প্যাকেজের মাধ্যমে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনটিও ডুয়েলগেজে রূপান্তর করতে হবে। এক্ষেত্রে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় কমলাপুর থেকে জুরাইন পর্যন্ত বিদ্যমান লাইনটি ডুয়েলগেজ করা হচ্ছে। বাকি অংশের মধ্যে জুরাইন থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন করা হবে। তবে চাষাঢ়া থেকে ৩০০ মিটার অংশে ডাবল লাইন করতে দশমিক ৫১ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। আর ওই অংশে টিনশেড থেকে সাততলা ভবন পর্যন্ত রয়েছে। এগুলোর ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৩৩ কোটি ৫১ লাখ দরকার হবে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ জুলাই রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে একটি বৈঠক আহ্বান করা হয়। এতে জানানো হয়, প্রস্তাবিত জমি আগে রেলের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। তবে পরে সিএস ও আরএস জরিপে এগুলো স্থানীয় জনগণের নামে রেকর্ড করা হয়ে যায়। তাই অধিগ্রহণকৃত জমি আবার অধিগ্রহণ করতে গেলে অডিট আপত্তি উঠতে পারে। আর চাষাঢ়া থেকে নারায়ণগঞ্জের দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার। তবে ওই অংশটি ডুয়েলগেজ করা জরুরি দরকার। এক্ষেত্রে বিদ্যমান লাইনের ওই অংশটি ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে। ফলে চাষাঢ়া থেকে নারায়ণগঞ্জ অংশটি ডাবল লাইন হবে না।

ব্যয় বৃদ্ধির আরও কিছু খাত আরডিপিপিতে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় তিনটি নতুন ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) জন্য একটি দোতলা ভবন কাম ব্যারাক নির্মাণ, সরকারি রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) জন্য একটি দোতলা ভবন কাম ব্যারাক নির্মাণ এবং গেণ্ডারিয়া থেকে চাষাঢ়ার মাঝে পাঁচটি গ্যাং হাট নির্মাণ নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে।

এদিকে বিদ্যমান রেললাইনটি সংস্কারে কোনো রক্ষণাবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কিন্তু বাস্তব কাজ করতে গিয়ে কিছু অংশ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়েছে। আবার জুরাইন থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত ডাবল লাইন নির্মাণের জন্য পরামর্শক চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে। সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে প্রকল্পটির পরিচালক মো. সেলিম রউফ শেয়ার বিজকে বলেন, বিদ্যমান রেললাইন ডাবল লাইন করা হলেও জমি অধিগ্রহণজনিত সমস্যার কারণে চাষাঢ়া থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত অংশটি ডাবল লাইন করা যাচ্ছে না। তাই ওই দুই কিলোমিটার অংশ বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনকেই ডুয়েলগেজ করা হচ্ছে। পরে পৃথক প্রকল্পের আওতায় বাকি অংশ ডাবল লাইন করা হবে।

যদিও এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ঠিক হচ্ছে না বলে মনে করছেন রেলওয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তারা বলছেন, জমি অধিগ্রহণ সমস্যা এড়াতে শুধু ৩০০ মিটার অংশ বাদ দেয়া যেত। এক্ষেত্রে চাষাঢ়া থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বাকি এক হাজার ৭০০ মিটার অংশ ডাবল লাইন করে রাখলে পরে ব্যয় কম হতো। তা না হলে বাদ দেয়া দুই কিলোমিটার অংশ আবার ডাবল লাইন করতে গিয়ে কমপক্ষে ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। আর ওই অংশ ডাবল লাইন না করা হলে ট্রেন চালানো বাড়ানো যাবে না।