প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

৭৬ পোশাক কারখানার ফাঁকি ৩৩৩ কোটি টাকা

বন্ড অনিয়ম

রহমত রহমান: বন্ডের অনিয়ম থেমে নেই। তবে পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপব্যবহারের অভিযোগ বেশি। শুল্ককর ফাঁকির পাশাপাশি রফতানির আড়ালে অর্থপাচারের প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ৭৬টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা করেছে এনবিআর।
এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি, প্রাপ্যতার অতিরিক্ত আমদানি, প্রাপ্যতাহীন আমদানি, ঘোষণার অতিরিক্ত আমদানি ও এক পণ্য ঘোষণায় অন্য পণ্য আমদানি এবং রফতানির আড়ালে অর্থপাচারের প্রমাণও পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এনবিআরের পাশাপাশি বিজিএমইএ’কে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
তালিকা অনুযায়ী, ৭৬ পোশাক কারখানার মধ্যে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ১৭টি, চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট ১৯টি, ঢাকা কাস্টম হাউস তিনটি, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ১৪টি, বেনাপোল কাস্টম হাউস ১০টি এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর ১৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩৩৩ কোটি টাকার অনিয়ম পেয়েছে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিতে কমিশনারদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং ব্যবস্থা নিতে বিজিএমইএ’কে তালিকা পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান।
১৩ পোশাক প্রতিষ্ঠানের ২৭৫ কোটি ৮২ লাখ টাকার শুল্ককর ফাঁকি ও অর্থপাচারের প্রমাণ পেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান হলো গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকার আইমান টেক্সটাইলস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি ও অর্থপাচারের মাধ্যমে ৮৫ কোটি ১২ লাখ টাকার ফাঁকি খুঁজে পেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা। তুরাগের মাসটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়ে ১২০ কোটি টাকার শুল্ককর ফাঁকি দিয়েছে। এছাড়া রাজধানীর পূর্ব রামপুরার আশিয়ানা গার্মেন্টস লিমিটেড ৩৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, টঙ্গীর কেপরি অ্যাপারেলস লিমিটেড ৭৩ লাখ টাকা ও তিন কোটি ৮৭ লাখ টাকা, খিলক্ষেত এলাকার নাফ ফ্যাশনস লিমিটেড পাঁচ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, ফতুল্লা নারায়ণগঞ্জের মিশুয়ার হোসিয়ারি মিলস প্রাইভেট লিমিটেড ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকা, চট্টগ্রামের অ্যাপারেলস অপসন ৬৮ লাখ টাকা, ফ্যাশন ক্রিয়েট লিমিটেড এক কোটি ৪৬ লাখ টাকা, ডিকে অ্যাপারেলস লিমিটেড দুই কোটি ৫৭ লাখ টাকা, ক্যাসিওপিয়া সোয়েটারস লিমিটেড আট লাখ টাকা ও জেএবি লিমিটেড পাঁচ লাখ টাকার শুল্ককর ফাঁকি দিয়েছে।
ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের তিন কোটি ৫৩ লাখ টাকার অনিয়ম উদ্ঘাটন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার দক্ষিণখান এলাকার নীপা নিটওয়্যারস, সাভারের রেজা ফ্যাশন লিমিটেড, গাজীপুরের ট্রাউজার ওয়ার্ল্ড প্রা. লিমিটেড, বটম গ্যালারি, ইউটা নিটিং অ্যান্ড ডায়িং লিমিটেড, মোহাম্মদপুরের সেলিব্রিটি এক্সপোর্ট গার্মেন্টস লিমিটেড, রাজধানীর কচুক্ষেত এলাকার সিনটেক্স টেক্সটাইল এস অ্যাপারেলস লিমিটেড, মিরপুর এলাকার কার্ডিয়াল ডিজাইন লিমিটেড, আল ইসলাম টেক্সটাইল লিমিটেড, করতোয়া অ্যাপারেলস, কায়সার সানকো জেবিটেক্স, টিএনজেড অ্যাপারেলস, অ্যাপেক্স ল্যানজারিং, জেনেসিস ফ্যাশনস ও লেভেন্ডার গার্মেন্টস লিমিটেড।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ১৪টি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রায় পৌনে সাত কোটি টাকার শুল্ককর ফাঁকি খুঁজে পেয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি ৩১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অনিয়মের মধ্যে রয়েছে, প্রাপ্যতার অতিরিক্ত কাঁচামাল আমদানি, এক পণ্য ঘোষণায় অন্য পণ্য আমদানি ও লাইসেন্সে প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কাঁচামাল আমদানি। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গাজীপুরের এম এইচ অ্যাপারেলস লিমিটেডের শুল্ককর ৬৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ও জরিমানা ১৫ লাখ টাকা, একই প্রতিষ্ঠানের অপর চালানে শুল্ককর ৬৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা ও জরিমানা ২০ লাখ টাকা, এআরএইচ নীট কম্পোজিট লিমিটেডের শুল্ককর ৬১ লাখ ও জরিমানা ১৩ লাখ টাকা, ক্রস লাইন নীট ফেব্রিক্স লিমিটেডের শুল্ককর পৌনে আট লাখ ও জরিমানা আট লাখ টাকা, সাভারের ডিজাইনার ফ্যাশন লিমিটেডের শুল্ককর দেড় লাখ টাকা, জরিমানা দেড় লাখ টাকা, চট্টগ্রামের গার্মেন্টস হোম প্রা. লিমিটেড শুল্ককর দেড় লাখ ও জরিমানা দেড় লাখ টাকা, ঢাকার গ্রীন ওয়ার্ল্ড ফ্যাশনস লিমিটেডের শুল্ককর সাড়ে ১০ লাখ ও জরিমানা সাড়ে ১০ লাখ টাকা, গাজীপুরের নিট বাজার প্রা. লিমিটেডের শুল্ককর সাড়ে ৩৬ লাখ ও জরিমানা ৫০ হাজার টাকা, হেমন্ত ইনভেটিভ লিমিটেডের শুল্ককর সাড়ে ৩৫ লাখ ও জরিমানা দুই লাখ টাকা, স্পারো অ্যাপারেলস লিমিটেডের শুল্ককর ৪৩ লাখ ও জরিমানা দুই লাখ টাকা, সুফী অ্যাপারেলস লিমিটেডের শুল্ককর এক কোটি ৭৭ লাখ ও জরিমানা ৪০ লাখ টাকা, একই প্রতিষ্ঠানের অপর চালানে শুল্ককর এক কোটি তিন লাখ ও জরিমানা ৩৫ লাখ টাকা, ময়মনসিংহের সুপ্তি সোয়েটার লিমিটেডের শুল্ককর সাড়ে চার লাখ ও জরিমানা আড়াই লাখ টাকা, একই প্রতিষ্ঠানের অপর চালানে শুল্ককর ৪৫ লাখ টাকা ও জরিমানা আড়াই লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট ১৯টি পোশাক কারখানার ৪৪ কোটি টাকার শুল্ককর ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে টিকেএম গার্মেন্টস লিমিটেডের ২৫ লাখ টাকা, আদিল অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৯ লাখ টাকা, ফোকাস অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৯৬ লাখ টাকা, মনটেক্স অ্যাপারেলস লিমিটেডের দেড় লাখ টাকা, আজমাইন ফ্যাশন লিমিটেডের ১৯ লাখ টাকা, প্রিটি অ্যাপারেলস লিমিটেডের ১৮ কোটি টাকা, সার্ক গার্মেন্টস লিমিটেডের দেড় কোটি টাকা, ফ্যাশন ক্রিয়েট অ্যাপারেলস লিমিটেডের আড়াই কোটি টাকা, এক্সিয়ম ফ্যাশন লিমিটেডের ৩০ লাখ টাকা, ওসেন অ্যাপারেলস লিমিটেডের সাড়ে ২২ লাখ টাকা, টিম অ্যাপারেলসের ৫৪ লাখ টাকা, হংকং ডেনিমের এক কোটি ১৩ লাখ টাকা, ভেনকট লিমিটেডের ৩০ লাখ টাকা, বেসটেক লিমিটেডের প্রায় ৯ কোটি টাকা ও এক কোটি ২৪ লাখ টাকা, বিডি ডিজাইন লিমিটেডের পৌনে ছয় কোটি টাকা ও ৫৯ লাখ টাকা।
ঢাকা কাস্টম হাউস মেরিনা অ্যাপারেলস লিমিটেড, টিঅ্যান্ডজেড অ্যাপারেলস লিমিটেড এবং ওসিস ফ্যাশন লিমিটেড নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৮ লাখ টাকা ফাঁকি প্রমাণিত হওয়ায় এক লাখ টাকা জরিমানা করেছে। অপরদিকে, বেনাপোল কাস্টম হাউস ১০টি পোশাক কারখানার প্রায় দুই কোটি টাকার অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নরসিংদীর চরকা টেক্সটাইল লিমিটেড, গাজীপুরের স্মাগ সুইটার লিমিটেড, ইয়োর ফ্যাশন সুয়েটার লিমিটেড, এসকিউ সেলসিয়াস লিমিটেড ও নরবান কমটেক্স লিমিটেড, সাভারের ফেব্রিকা নিট কম্পোজিট লিমিটেড, টাঙ্গাইলের ইমপ্রেস নিউ টেক্স কম্পোজিট টেক্স প্রভৃতি।
বিজিএমইএ’র সভাপতি রুবানা হক বন্ড অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে শেয়ার বিজকে বলেন, একজন অন্যায় করলে সবাইকে দোষারোপ করা যায় না। বন্ড নিয়ে যত রকম ভ্রান্তি আছে, তা দূর করতে যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এনবিআরের তালিকা আমরা এখনও পাইনি। তালিকা পেলে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

 

সর্বশেষ..