প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

তানাকা গ্রুপের খুঁটির জোর কোথায়?

৮৮২ কোটি টাকা খেলাপি

জয়নাল আবেদিন: দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপিদের একটি তানাকা গ্রুপ। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এখন আর তা ফেরত দিচ্ছে না গ্রুপটি। ঋণ পরিশোধ না করেও উপর মহলের সহযোগিতায় নিয়মিত গ্রাহক, সিআইবি ক্লিন ও নতুন ঋণ পাওয়ার চেষ্টায় মত্ত গ্রুপটি। এছাড়া ঋণ শোধ না করে নানা রকম তদবিরে ব্যস্ত গ্রুপটি। তবে অনেকেই জানে না এদের খুঁটির জোর কোথায়।

সূত্র জানায়, তানাকা গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠান মাইটস স্পিনিং মিলস লিমিটেড। আরোপিত ও অনারোপিতসহ মোট ৭০ কোটি টাকা মওকুফ করার পরও মাইটস স্পিনিংয়ের ২৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ঋণ পরিশোধে এক বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ছয় বছরের সময় চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে অনুমোদন দিতে নারাজ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পক্ষে একাধিক যৌক্তিক কারণ রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তানাকা গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সব মিলেয়ে ৮৮২ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে সোনালী ব্যাংকের। কিন্তু এর বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নেই। এরপরও গ্রুপটিকে একাধিকবার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়া হয়েছে। তারপরও ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি তারা। এই অবস্থায় ঋণগুলো পর্যাপ্ত জামানত দিয়ে আচ্ছাদিত করতে সোনালী ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি ঋণ বিতরণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনিয়ম চিহ্নিত হলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এদিকে দীর্ঘদিন থেকে ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে তারা। আর দীর্ঘদিনের মন্দ ঋণ আদায়ের জন্য বারবার নিলাম দিয়েও বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রি করা সম্ভব না হওয়া, জামানতের নীট পজিশন ঋণাত্মক হওয়া, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে পুনঃবিনিয়োগের সুযোগ করে দেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছে সোনালী ব্যাংক। কিন্তু এ আবেদনে সাড়া নাও দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক।

শুধু সোনালী নয় অগ্রণী ব্যাংকেও ঋণ খেলাপি গ্রুপটি। ঋণ পুনঃতফসিলে অনুমতি না দেয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট করেছিল মাইটস স্পিনিং মিলস (প্রা.) লি.। ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পুনঃতফসিলে অনুমতি না দেয়ার কারণ জানতে চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বরাবর চিঠি দেয় হাইকোর্ট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। উল্টো দেয়া হচ্ছে নানা সুবিধা। তাই এমন সাহসের বহিঃপ্রকাশ।

এ বিষয়ে অর্থঋণ আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন শেয়ার বিজকে বলেন, বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি ব্যাংকের গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে বিশেষ সুবিধা দিয়ে সার্কুলার জারি করে। সেই সার্কুলারে উল্লিখিত নিয়ম অনুসরণ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করা যায়। যদি কেউ সেই নিয়ম অনুসরণ না করে তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো একক ব্যক্তির জন্য ভিন্ন নিয়ম করতে পারে না। আর দেশের যেকোনো নাগরিক হাইকোর্টে রিট করতে পারে। এতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে তদন্তের ভিত্তিতে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন কোর্ট।

এর আগে একই গ্রুপের জন্য পাঁচ লাখ টাকার জরিমানা গুনেছে অগ্রণী ব্যাংক। অগ্রণী ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তানাকা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সুইস কোয়ালিটি পেপারের ১৪ কোটি টাকা ও ডিসেম্বরে ১৩ কোটি টাকার ঋণপত্র খোলে অগ্রণী ব্যাংক। ওই সময়ে গ্রুপটি ১০৩ কোটি টাকার ঋণখেলাপি অবস্থায় ছিল। পাশাপাশি সুইস কোয়ালিটি পেপারকে নতুন করে দেয়া ঋণসুবিধার বিষয়টি এক বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোতে (সিআইবি) যুক্ত করেনি ব্যাংকটি। এ ছাড়া গ্রুপটির অন্য প্রতিষ্ঠান মারহাবা স্পিনিং লিমিটেডের ২৬৯ কোটি টাকার তথ্যও সিআইবিতে যুক্ত করা হয়নি।

২৫ অক্টোবর ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিঠি দিয়ে অগ্রণী ব্যাংককে জানায়, এসব বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হয়নি। এ জন্য পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি মারহাবা স্পিনিংয়ের ২৬৯ কোটি টাকার তথ্য সিআইবিতে যুক্ত করার দায়িত্ব যাদের ছিল, তাদের বিষয়ে বিধিমোতাবেক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দিনের পর দিন বিভিন্ন সুবিধা পেতে পেতে ঋণখেলাপিদের লোভ আরও বেড়েছে। খুব দ্রুত এসব সুবিধা বন্ধ করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল, আংশিক এককালীন পরিশোধের মতো ছাড় ও সুবিধা দেয়ার পরও চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আগের তিন মাসের চেয়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ?১০ হাজার কোটি টাকা; শতকরা হারে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। দেশের ব্যাংকিং খাতে ২০২১ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে গত মার্চে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা।

একাধিক ব্যাংকে ঋণখেলাপির বিষয়টি স্বীকার করে তানাকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মহিউদ্দিন ওরফে মাহিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমার প্রজেক্টে ব্যাংকের ইনভেস্টমেন্টই বেশি, প্রায় ৭০ শতাংশ। আমার বিনিয়োগ ৩০ শতাংশ। তাই সব ব্যাংকই চেষ্টা করছে ঋণগুলো পুনঃতফসিল করানোর। তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকেই কোম্পানি বন্ধ। এটা পুনরায় চালু করার জন্য আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমার মালের তো প্রচুর চাহিদা। পাশাপাশি আমার কোম্পানির যন্ত্রপাতি ও মেশিনগুলো এখনও ভালো রয়েছে। কিন্তু কিছু কারণ আছে তাই ব্যাকফুটে চলে গেছি। তবে কিছু সুযোগ-সুবিধা পেলে আমার কোম্পানি আবার ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমি আশাবাদী।’