দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

৯ কোম্পানির ক্যাপাসিটি চার্জ ১৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা

বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। এতে বাড়ছে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝাও। গত এক দশকে শুধু এ চার্জ থেকেই প্রচুর আয় করেছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ এক দশকে কোন কোম্পানি কত আয় করেছে, তা সম্প্রতি অনুসন্ধান করেছে শেয়ার বিজ। এ নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের আজ ছাপা হচ্ছে চতুর্থ পর্ব

ইসমাইল আলী: বেসরকারি খাতে গত জুন পর্যন্ত স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ৯৬। যদিও উৎপাদনে ছিল ৮৪টি কেন্দ্র। এর মধ্যে সামিট ও ইউনাইটেড ছাড়াও দেশীয় বেশ কিছু করপোরেট গ্রুপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে। এ ধরনের ৯টি বড় গ্রুপ এবং কোম্পানির কেন্দ্রগুলোর জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) গত এক দশকে ১৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে।

পিডিবির তথ্যমতে, বর্তমানে ওরিয়ন গ্রুপের চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ২০১০-১১ অর্থবছর উৎপাদন শুরু করে মেঘনাঘাট কুইক রেন্টাল কেন্দ্রটি। ১০০ মেগাওয়াটের ফার্নেস অয়েলচালিত এ কেন্দ্রটির মালিকানা রয়েছে আইইএল কনসোর্টিয়াম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের নাম। ১০ বছরে এ কেন্দ্রটির জন্য পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে এক হাজার ৩৭৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

একইভাবে ২০১০-১১ অর্থবছরে উৎপাদনে আসে ওরিয়নের সিদ্ধিরগঞ্জ কুইক রেন্টাল, যার স্পন্সর কোম্পানি ডাচ্-বাংলা পাওয়ার। ১০০ মেগাওয়াট এ কেন্দ্রটিও ফার্নেস অয়েলচালিত। এজন্য এক দশকে পিডিবির ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে এক হাজার ৩৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে উৎপাদনে আসে ডিজিটাল পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। নারায়ণগঞ্জে গোগনগরে স্থাপিত ১০২ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্রটিও ফার্নেস অয়েলচাতি। এ কেন্দ্রের সাত বছরে পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে ৫০৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

ওরিয়নের ১০৫ মেগাওয়াটের খুলনায় নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করে ২০১৮-১৯ অর্থবছর। ফার্নেস অয়েলচালিত এ কেন্দ্রের জন্য দুই বছরে পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে ২২৭ কোটি টাকা। এছাড়া গত অর্থবছর সোনারগাঁয়ে ওরিয়নের আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হয়েছে। তবে বছরের শেষ দিকে চালু হওয়া এ কেন্দ্রের জন্য কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়নি। ফলে এক দশকে ওরিয়নের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য পিডিবির ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে তিন হাজার ৪৫২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

এদিকে ২১০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র নিয়ে যাত্রা শুরু করে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল)। ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছর কোম্পানিটির আরও দুটি কেন্দ্র উৎপাদনে আসে। এগুলোর সক্ষমতা ছিল যথাক্রমে ৫২ ও ২৫ মেগাওয়াট। আর গত অর্থবছর ১০৫ মেগাওয়াটের আরেকটি কেন্দ্র উৎপাদনে আসে। বর্তমানে এ কোম্পানির চার বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ৩৯২ মেগাওয়াট। আর এক দশকে এ কোম্পানিটির পকেটে ক্যাপাসিটি চার্জ গেছে তিন হাজার ৪৫২ কোটি ছয় লাখ টাকা।

একইভাবে ২০১১-১২ অর্থবছরে উৎপাদনে আসে বাংলা ক্যাট গ্রুপের অ্যাক্রোন ইনফ্রাস্ট্রাকচার সার্ভিসেস কোম্পানির একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফার্নেস অয়েলচালিত এ কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা ১০০ মেগাওয়াট। ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০০ মেগাওয়াট করে আরও দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করেছে কোম্পানিটি। এক দশকে এ তিন কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল এক হাজার ৪৪৯ কোটি আট লাখ টাকা।

এর বাইরে ২০১৭-১৮ অর্থবছর এ গ্রুপের বাংলা ট্রাক ইউনিট-১ ও ইউনিট-২ নামে দুটি কেন্দ্র উৎপাদনে আসে। ডিজেলচালিত এ দুই কেন্দ্রের সক্ষমতা ৩০০ মেগাওয়াট। এজন্য ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়েছে এক হাজার ১৪৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে বাংলা ক্যাট গ্রুপটি ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ নিয়ে গেছে দুই হাজার ৫৯৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

এদিকে হোসাফ গ্রুপের এনার্জি প্রিমা বিদ্যুৎ খাতে গত এক দশক ধরেই উৎপাদনে রয়েছে। এর মধ্যে ২০১০-১১ অর্থবছরে শাহজিবাজার ও কুমারগাঁওয়ে ৫০ মেগাওয়াট করে দুটি কেন্দ্র দিয়ে যাত্রা শুরু করে কোম্পানিটি। পরের অর্থবছর ২০ ও ৫০ মেগাওয়াটের আরও দুটি কেন্দ্র যুক্ত হয় বগুড়া ও ফেঞ্চুগঞ্জে। এতে উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়ায় ১৭০ মেগাওয়াট। এছাড়া গত অর্থবছর ১১৩ মেগাওয়াটের এইচপি পাওয়ার নামে আরেকটি কেন্দ্র চালু করে হোসাফ গ্রুপ। আর সব মিলিয়ে এক দশকে কেন্দ্রগুলোর হোসাফ গ্রুপের আয় হয় দুই হাজার ৯৫ কোটি টাকা।

একইভাবে ১০ ও ১০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র নিয়ে ২০১০-১১ অর্থবছরে যাত্রা শুরু করে বেসরকারি খাতের দেশ এনার্জি। ২০১৮-১৯ অর্থবছর এ গ্রুপের ২০০ মেগাওয়াটের আরেকটি কেন্দ্র উৎপাদন শুরু করেছে। যদিও চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় গত অর্থবছর ১০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে গত অর্থবছর দেশ এনার্জির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২১০ মেগাওয়াট। আর এক দশকে এ কোম্পানিটি ক্যাপাসিটি চার্জ থেকে আয় করেছে এক হাজার ৯১০ কোটি পাঁচ লাখ টাকা।

এদিকে বেসরকারি খাতের ম্যাক্স পাওয়ার (৭৮ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করে ২০১০-১১ অর্থবছর। তবে তিন বছর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২০১৪-১৫ অর্থবছর কেন্দ্রটির উৎপাদন বন্ধ ছিল। পরে পিডিবি চুক্তি নবায়ন করায় আবারও উৎপাদন শুরু করে ম্যাক্স পাওয়ার। এতে ৯ বছরে কেন্দ্রটির ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয় এক হাজার ২৪৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এছাড়া এ গ্রুপের কুশিয়ারা পাওয়ার যাত্রা শুরু করে ২০১৭-১৮ অর্থবছর। এতে তিন বছরে কেন্দ্রটির ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়েছে ৪৫৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ফলে গ্রুপটি ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ এক দশকে আয় করেছে এক হাজার ৭০৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

অন্যদিকে ২০১০-১১ অর্থবছরে যাত্রা শুরু করে পাওয়ার প্যাকের ১০০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র। ২০১৬-১৭ অর্থবছর উৎপাদনে আরে এ কোম্পানির ৯৪ মেগাওয়াটের আরেকটি কেন্দ্র। এতে বর্তমানে পাওয়ার প্যাকের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়ে ১৯৪ মেগাওয়াট। আর এগুলোর জন্য কোম্পানিটি আয় করেছে এক দশকে এক হাজার ৬১২ কোটি ১২ লাখ টাকা।

একইভাবে আমনুরায় ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে এ খাতে যাত্রা শুরু করে সিনহা গ্রুপ। পরে ২০১৪-১৫ অর্থবছর ৫৩ মেগাওয়াটের আরেকটি কেন্দ্র উৎপাদনে আনে সিনহা পাওয়ার। এছাড়া ভেঞ্চার এনার্জি নামে সিনহা গ্রুপের ৩৩ মেগাওয়াটের আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২০১০-১১ অর্থবছর যাত্রা শুরু। সব মিলিয়ে সিনহা গ্রুপের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৩৬ মেগাওয়াট। আর এক দশকে এ কেন্দ্রগুলোর জন্য সিনহা গ্রুপ ক্যাপাসিটি চার্জ পেয়েছে এক হাজার ২০৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

এদিকে ২০১০-১১ অর্থবছর ২২ মেগাওয়াট করে দুটি কেন্দ্রে ৪৪ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে বিদ্যুৎ খাতে যাত্রা শুরু করে ডরিন পাওয়ার। তবে ২০১৫-১৬ অর্থবছর ৫৫ মেগাওয়াটের একটি ও ২০১৬-১৭ অর্থবছর ৫৫ মেগাওয়াটের আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে কোম্পানিটি। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছর বাঙ্কো এনার্জি নামে আরেকটি ৫৪ মেগাওয়াটের কেন্দ্র চালু করে ডরিন পাওয়ার। সব মিলিয়ে বর্তমানে কোম্পানিটির উৎপাদন সক্ষমতা ২০৮ মেগাওয়াট। আর এসব কেন্দ্রের জন্য এক দশকে ডরিন পাওয়ার ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে আয় করেছে এক হাজার ১৮৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

উল্লিখিত ৯ গ্রুপ বা কোম্পানির বাইরে ছোট ও মাঝারি দেশীয় আরও ১৭টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রের জন্য পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে আরও প্রায় আট হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শাহজিবাজার ও মিডল্যান্ড পাওয়ারের ক্যাপাসিটি চার্জ ৯২৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, বারাকা পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের ৯১৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, প্রিসিশন এনার্জির ৮২১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, রিজেন্ট পাওয়ারের ৭৭৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, ডিপিএ’র (পাগলা) ৭৫৫ কোটি দুই লাখ টাকা, অটবি গ্রুপের কোয়ান্টাম পাওয়ারের ৬৮৬ কোটি ১১ লাখ টাকা, এনার্জিস পাওয়ারের ৫৭৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, নর্দার্ন পাওয়ারের ৫৮৩ কোটি টাকা এবং এনার্জি প্যাকের ৫৪৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..