নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের পুঁজিবাজার যেন ধীরে ধীরে এর পথ হারাচ্ছে। একসময় এই বাজার ছিল স্বপ্ন বুননের ক্ষেত্রÑহাজারো সাধারণ বিনিয়োগকারী আশায় বুক বাঁধতেন, শেয়ার কিনে জীবনের উন্নতির গল্প লিখতেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের টানা মন্দাভাব, আস্থাহীনতা আর অস্থিরতায় সেই স্বপ্নের জায়গায় এখন ভর করছে হতাশা। এর ফলে মাত্র ৯ মাসেই ৬২ হাজার বিনিয়োগকারী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। কেউ পুরোপুরি বাজার ছেড়েছেন, আবার অনেকেই শেয়ারহীন হয়ে অনিশ্চয়তার দোলাচলে সময় পার করছেন।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) উপাত্ত বলছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের মোট বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৩২ হাজার ২২৭টি। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৪৫২টি। অর্থাৎ ৯ মাসের ব্যবধানে কমেছে ৩০ হাজার ২২৫টি বিও হিসাব। একই সময়ে শেয়ারশূন্য বিও হিসাব বেড়েছে ৩১ হাজার ৮৮৫টি। সব মিলিয়ে ৬২ হাজার ১১০ বিনিয়োগকারী কার্যত বাজারবিমুখ হয়েছেন।
শেয়ার থাকা হিসাবও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত বছরের ডিসেম্বরে ১২ লাখ ৭১ হাজার ৭৫৯টি বিও হিসাব সক্রিয় ছিল, যেখানে শেয়ার ও ইউনিটের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১৫৬ কোটি। সেপ্টেম্বর শেষে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৯ হাজার ২০৭টিতে। বাজারমূল্যও সামান্য বেড়ে হলেও বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমে গেছে। অন্যদিকে শেয়ারশূন্য বিও হিসাব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৮৫৯টিতে, যা গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৪টি।
বিনিয়োগকারীদের এই সরে যাওয়া কেবল সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি তাদের হতাশা ও ক্ষতির প্রতিফলন। পুরুষ বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে ১৯ হাজার ৭২২টি এবং নারী বিনিয়োগকারীদের কমেছে ১০ হাজার ৭৩৫টি। দেশি বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব কমেছে ২৭ হাজার ৫৬৭টি এবং বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের কমেছে ২ হাজার ৮৯০টি।
একটি ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী এ বিষয়ে বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আতঙ্ক বিরাজ করছে। বাজারে আস্থা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃশ্যমান পদক্ষেপ দরকার। নতুন আইপিও না আসাও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
রাজধানীর খিলগাঁয়ে বসবাসকারী মধ্যবিত্ত এক বিনিয়োগকারী বলেন, পুঁজিবাজারে টাকা ঢুকিয়েছিলাম ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে। ভেবেছিলাম একটু সঞ্চয় বাড়বে। কিন্তু এখন সেই টাকাই ডুবে গেছে। প্রতিদিন চিন্তা করিÑভুল করলাম না তো?
হাজারো বিনিয়োগকারী আজ একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি। একসময় পুঁজিবাজার ছিল স্বপ্ন গড়ার জায়গাÑছোট্ট বিনিয়োগ থেকে বড় স্বপ্ন দেখার ভরসাস্থল। কিন্তু দীর্ঘদিনের টানা মন্দাভাব, নতুন আইপিও না আসা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগে ধীরগতি আর বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় সেই ভরসা দিনে দিনে হারাচ্ছে আলো।
তবে আশার কথাও শোনালেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব রক্ষণাবেক্ষণের ফি কমানো হয়েছে। এছাড়া বাজারকে দীর্ঘ মেয়াদে শক্তিশালী করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এগুলোর প্রভাব দেখা দিলে আস্থা ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে।’
এদিকে বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের যে বিও হিসাব আছে তার মধ্যে একক নামে আছে ১১ লাখ ৮৮ হাজার ১৭টি, যা গত ৩১ আগস্ট ছিল ১১ লাখ ৮১ হাজার ৭৯৮টি। অর্থাৎ গত এক মাসে একক নামে বিও হিসাবে বেড়েছে ৬ হাজার ২১৯টি। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের যৌথ নামে বিও হিসাব আছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৪৭৯টি। গত ৩১ আগস্ট যৌথ বিও হিসাব ছিল ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৭১টি। অর্থাৎ গত এক মাসে যৌথ বিও হিসাব বেড়েছে ১ হাজার ৪০৮টি।
পুঁজিবাজারের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ৩১ আগস্ট প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৫৯৪ পয়েন্ট। সেখান থেকে এখন ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৪১৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ১৭৯ পয়েন্ট।
অন্যদিকে ৩১ আগস্ট ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ২৮ হাজার ৪৮ কোটি টাকা। এখন ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ২৫ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজার মূলধন কমেছে ২ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এদিকে হাজার কোটি টাকার ওপরে উঠে যাওয়া লেনদেন এখন ৬০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে এসেছে। শেষ ১৫ কার্যদিবসের ডিএসইতে হাজার কোটি টাকার লেনদেনের দেখা মেলেনি।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, বছরজুড়ে পুঁজিবাজার ছিল মন্দায়। পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে।
অনেকের মতে, দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বাজারে ক্রমাগত দরপতনের ফলে পুঁজি হারিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা ছিল পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন মেলেনি। এমন পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী, কিছু ব্রোকার প্রতিনিধি এবং বিনিয়োগকারীদের সংগঠনগুলো মনে করছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতাই পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট ও অস্থিরতার মূল কারণ।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পুঁজিবাজারের এ সংকট দীর্ঘদিনের, যার সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত, কার্যকরী ও যুগোপযোগী সংস্কার। এর বাস্তবায়ন রাতারাতি করা সম্ভব না হলেও সকল অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পুঁজিবাজারে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করেন তারা।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post