প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

 বেনাপোল স্থলবন্দর: সিসি ক্যামেরা নেই, বাড়ছে চুরি

 

কাজী আশরাফুল আজাদ, যশোর : বাণিজ্যিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য আজো সিসি ক্যামেরার আওতায় আসেনি দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল। বন্দর কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে এখানে সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে না। এতে চুরিসহ অব্যবস্থাপনা বাড়ছে, ক্ষতির শিকার হচ্ছেন আমদানি-রফতানিকারকরা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, বন্দরে সিসি ক্যামেরা ব্যবসায়ীদের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। বিভিন্ন বৈঠকে ব্যবসায়ীরা সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জোর দাবি জানালেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭২ সালে বেনাপোল বন্দরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ওয়্যার হাউজিং করপোরেশনের মাধ্যমে বেনাপোল বন্দরের কার্যক্রম চালু হয়। ভৌগোলিক কারণে দ্রুতই এটি দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দরে পরিণত হয়। প্রথম অবস্থায় মোংলা সমুদ্রবন্দরের অধীনে স্থলবন্দরটির কার্যক্রম চলতো। ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এটি বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে এখানে চোরদের দৌরাত্ম্য আছে। চোর চক্রের সদস্যরা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের ক্যাডার, সন্ত্রাসী ও লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্য। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই দলের লোকরা বন্দরে চোর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন জানান, প্রতিটি বৈঠকে উন্নয়নের ব্যাপারে বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখানে কোনো নজরদারি নেই। অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখানে সুনজর দিলে রাজস্ব আদায় অনেক বেশি বাড়তো বলেও জানিয়েছেন তিনি।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বৃহত্তম স্থলবন্দরটিতে চুরি ঠেকাতে কয়েক বছর আগে শেডে বেশ কয়েকটি সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল।  কিছু দিন যেতে না যেতেই এসব ক্যামেরা নষ্ট করে ফেলা হয়। বন্দরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী পণ্য চুরির সঙ্গে জড়িত থাকায় সিসি ক্যামেরাগুলো নষ্ট করে ফেলা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এদিকে বেনাপোল বন্দর থেকে ভারতের পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তম নগর কলকাতার দূরত্ব মাত্র ৮৪ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে রওনা হয়ে ৪ ঘণ্টায় একটি ট্রাক আমদানি পণ্যের চালান কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বেনাপোল বন্দরে পৌঁছতে পারে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এ পথে বাণিজ্যেই বেশি আগ্রহ দেখান।

বেনাপোল বন্দর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আমদানি পণ্য প্রবেশদ্বারসহ দুই কিলোমিটার বন্দর এলাকাজুড়ে কোথাও কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। দরকার ছাড়া বন্দরের মধ্যে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ থাকলেও অবাধে বহিরাগতরা ঢুকছেন। বন্দর অভ্যন্তরের সড়ক ও পণ্যাগারের (শেড) বেহাল দশা। চলতি বছরের ১৬ নভেম্বর দায়িত্ব পালনের সময় চোর সিন্ডিকেটের হামলায় এক আনসার সদস্য ফিরোজ খুন হন। আর চোরাই পণ্য কেনা-বেচার জন্য বন্দরের সামনেই নামে-বেনামে শতাধিক দোকান গড়ে উঠেছে। এমন অব্যবস্থাপনার কারণে ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না।

বেনাপোলের আমদানিকারক হাদিউজ্জামান জানান, ‘বন্দরে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে তার আমদানিকৃত ৫০ লাখ টাকার পণ্য পুড়ে যায়। বন্দরে সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা থাকলে এসব ঘটনা হয়তো ঘটতো না।’

বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) আবদুল জলিল বলেছেন, বন্দরে সিসি ক্যামেরা লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একাধিকবার জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেনাপোল বন্দরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি ছিল ২০৩ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ঘাটতি আট কোটি ৭১ লাখ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ঘাটতি ১৩৪ কোটি ৭৩ লাখ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ঘাটতি ৪৫২ কোটি ৮৯ লাখ ও ২০১১-১২ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ১৯৪ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ভারত থেকে ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ৩৪৮ টন বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে; যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কমে ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৯৮৩ টনে দাঁড়িয়েছে।