মো. মামুন অর রশিদ : হাজারো প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গে নিয়েই জীবন এগিয়ে চলে। দরিদ্রতা, অসুস্থতা, বেকারত্ব, প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রভৃতি প্রতিবন্ধকতা আমাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন ও দুর্বিষহ করে তোলে। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে অনেকেই দুর্বল হয়ে পড়েন। কেউ কেউ জীবনসংগ্রামে হেরে যান। জীবনসংগ্রামের চরম দুঃসময়ে রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি মানুষের পাশে দাঁড়ায় এক শক্তিশালী সহায়তা হিসেবে। এটি কেবল আর্থিক সহায়তা নয়; বরং মানুষের মনোবল জাগিয়ে তোলার এক মানবিক বার্তাও বহন করে। সেই বার্তা হলোÑ‘রাষ্ট্র তার নাগরিকদের দুর্দিনে একা ফেলে রাখে না।’
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার জনগণের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব পালন করে থাকে। নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিই সরকারের নীতিনির্ধারণ ও কর্মপরিকল্পনার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। যে নির্বাচনী ইশতেহার দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে, সেই ইশতেহারে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। সেই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজে ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠা করা।
বর্তমান সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে অন্যতম হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’। এর মূল উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারকে নিয়মিত সহায়তার আওতায় আনা। এই কর্মসূচির আওতায় পরিবারপ্রধান নারীর নামে কার্ড প্রদান করা হবে, যাতে পরিবারে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নও নিশ্চিত হয়। প্রায় ৪ কোটি প্রান্তিক পরিবারের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে পরিবারপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকার আর্থিক সহায়তা অথবা খাদ্য সুবিধা যেমনÑচাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য প্রদান করা হবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ২ দিন পর অর্থাৎ ১৯ ফেব্রুয়ারি ‘ফ্যামিলি কার্ড প্রদান-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’ গঠন করেছে। এই কমিটি ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের একটি উপযুক্ত ডিজাইন এবং সুবিধাভোগী নির্বাচন পদ্ধতি প্রণয়ন করবে।
১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ফ্যামিলি কার্ড প্রদান কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বর্তমানে বাংলাদেশের ৪ কোটি ১৭ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের কবলে নিপতিত। দেশের প্রায় ৫৩ লাখ বিধবা নারী, ৪৬ লাখ প্রতিবন্ধী, ঋণে নিমজ্জিত বিপুল সংখ্যক পরিবার, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত জনগোষ্ঠী এবং খাদ্য-নিরাপত্তাহীন মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বর্তমান সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা যুগোপযোগী ও টেকসই নয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার মানবিক ও মর্যাদাভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হবে এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন নিশ্চিত করতে তথ্যভিত্তিক তালিকা প্রস্তুত করা হবে। একই সঙ্গে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের জন্য আলাদা সহায়তা কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকর করতে হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার এ খাতে অনিয়ম ও দ্বৈত সুবিধা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বরাদ্দকৃত অর্থ যেন অন্য খাতে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়েও নজরদারি বাড়ানো হবে।
এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানÑবিশেষ করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। উপকারভোগী নির্বাচন, তদারকি এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় প্রশাসনকে আরও ক্ষমতায়িত করার মাধ্যমে সেবার মান উন্নত করার চেষ্টা করা হবে। নগদ সহায়তা সরাসরি পরিবারের ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করা হবে। বর্তমান সরকার বিভিন্ন সামাজিক ভাতার পরিমাণ সময়োপযোগী করার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে। বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারী, অসহায় প্রবীণ এবং অন্যান্য দুস্থ জনগোষ্ঠীর ভাতা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে কর্মরত মানুষের বার্ধক্যকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ পেনশন ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দেশের কিছু অঞ্চল শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত সুবিধা থেকে এখনও বঞ্চিত। এসব এলাকাকে চিহ্নিত করে সেখানে উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব অঞ্চলে কর্মসংস্থান এবং মৌলিক সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর ফলে আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস করা সম্ভব হবে।
সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য বিভিন্ন সুবিধা আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। গণপরিবহনে তাদের চলাচল সহজ করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে নাগরিক সেবাকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য উপযোগী করারও উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকার দেশের তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী, বেদে সম্প্রদায়সহ অবহেলিত বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করবে। এছাড়া ভাসমান ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ও বিবেচনা করা হবে। হতদরিদ্র এতিম শিশু ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হতদরিদ্র এতিম শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভরণপোষণ তহবিল গঠন করার পাশাপাশি তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নিয়ে এসে তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।
সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হলো কৃষক কার্ড। এর মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্য মূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা এবং স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি, স্বল্প ব্যয়ে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, কৃষি বিমা সুবিধা, ন্যায্য মূল্যে কৃষি পণ্য বিক্রয়ের সুবিধা ও কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ পাওয়া যাবে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের মোবাইল ফোনে সহজেই আবহাওয়া ও বাজারদরের তথ্য পৌঁছে যাবে। একই সঙ্গে মোবাইলের মাধ্যমে ফসলের রোগ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া পাওয়া যাবে। এই সুবিধা শুধু ফসল চাষিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিরাও কৃষক কার্ডের আওতায় সমানভাবে উপকৃত হবেন। পাশাপাশি, কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এ সহায়তার অন্তর্ভুক্ত হবেন। প্রকৃত কৃষকদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে উš§ুক্ত আলোচনার মাধ্যমে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে একটি তথ্যভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরি করা হবে।
কৃষকদের আর্থিক চাপ কমাতে কৃষি ঋণ-সংক্রান্ত কিছু পদক্ষেপ সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। সরকার শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে গৃহীত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করবে। এছাড়া নিবন্ধিত এনজিও থেকে নেওয়া ক্ষুদ্রঋণের এক বছরের কিস্তি সরকার ঋণগ্রহীতাদের পক্ষ থেকে পরিশোধ করবে। এর ফলে কৃষক পরিবারগুলো সাময়িক অর্থনৈতিক স্বস্তি পাবে। কৃষি খাতকে ঝুঁকিমুক্ত ও টেকসই করতে বিমা ব্যবস্থায় গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের ক্ষতি কমানো এবং কৃষি উৎপাদনে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে শস্য বিমা, পশু বিমা, মৎস্য বিমা এবং পোলট্রি বিমা চালু ও সম্প্রসারণ করা হবে। প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতেও উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মানসম্মত ফিড উৎপাদন, পর্যাপ্ত পশু চিকিৎসা-সেবা, উন্নত প্রজাতি উদ্ভাবন এবং আধুনিক চাষপদ্ধতি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হবে। উপকূলীয় খাল, হাওর ও জলমহাল স্থানীয় জেলেদের জন্য উš§ুক্ত করার পাশাপাশি নিষিদ্ধ মৌসুমে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও জোরদার করা হবে। সব মিলিয়ে কৃষি খাতকে আধুনিক প্রযুক্তি, ন্যায্য বাজারব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার মাধ্যমে শক্তিশালী করে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে নতুন গতি আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হলো নারীর ক্ষমতায়ন। এই বিশ্বাস থেকে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারীশিক্ষার প্রসারে মেয়েদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ এবং একাডেমিক ও কারিগরি শিক্ষায় সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত রাজনীতি, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নারীর স্বাস্থ্য, প্রজনন অধিকার, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, এসিড নিক্ষেপ, অনলাইন হয়রানি, ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া, ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘নারী কল্যাণ কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দেওয়া হবে। নারীদের স্বনির্ভরতা বাড়াতে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পে যোগ্যতার ভিত্তিতে নারী উদ্যোক্তাদের বিনাসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি নারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং মার্কেটিং সাপোর্ট প্রদান করা হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে বর্তমান সরকার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মূল লক্ষ্য দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালীকরণ এবং নারীর ক্ষমতায়নকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি সফল করতে সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচনে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে এবং সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবেÑএমনটাই প্রত্যাশা।
বিসিএস তথ্য ক্যাডার এবং উপপরিচালক
চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর
