নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : বেসরকারি খাতের চারটি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলোÑন্যাশনাল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন অনিয়ম, ত্রুটি-বিচ্যুতি ঠেকাতে ও গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষায় পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
গতকাল সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষকদের কাছে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকে পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ব্যাংক সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট-১২ বিভাগের পরিচালক মুনির আহমেদ চৌধুরী। আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক করা হয়েছে ইসলামিক ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আনিসুর রহমানকে।
এছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংকে পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের পরিচালক এএনএম মঈনুল কবির এবং আইএফআইসি ব্যাংকে ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট-১-এর পরিচালক একেএম কামরুজ্জামানকে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ, নির্বাহী কমিটি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় অংশ নেবেন এবং ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরই পরিচালনা বেশকিছু ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এরপর সেই ব্যাংকগুলো পরিচালনা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া স্বতন্ত্র ও শেয়ারধারী পরিচালকেরা। পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নিÑএমন চার ব্যাংকে এবার পর্যবেক্ষক বসিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত এসব ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় পর্যবেক্ষক বসানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে ন্যাশনাল ব্যাংক পরিচালনা করত জয়নুল হক সিকদারের সিকদার গ্রুপ, প্রিমিয়ার ব্যাংক পরিচালনা করত এইচ বি এম ইকবালের প্রিমিয়ার গ্রুপ। আইএফআইসি ব্যাংক পরিচালনা করত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা করতেন এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ।
এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রভিশন ঘাটতিতে ভুগছে ন্যাশনাল ব্যাংক। বিগত গভর্নরের শেষ সময়ে তারল্য সংকট মোকাবিলায় ব্যাংকটিকে জরুরি তহবিল হিসেবে এক হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের নগদ টাকা উত্তোলনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ৯০ দিনের জন্য এ তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
নানা অনিয়মে জড়িয়ে ধুঁকছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের প্রায় পুরোটা সময় ব্যাংকটির পর্ষদ প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদার মারা যাওয়ার পরপর তার ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিবাদের জেরে ব্যাংকটির অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ে।
এমন প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ন্যাশনাল ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয় স্বতন্ত্র পরিচালক সৈয়দ ফারহাত আনোয়ারকে। তার সময়ে ইউনাইটেড কমার্সিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংককে একীভূত করার আলোচনা শুরু হয়। তবে পরে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০২৪ সালের মে মাসে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। সে সময় ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের হাতে। পর্ষদের অনেক পরিচালকই সরাসরি বা ভিন্ন নামে এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ব্যাংকটির পর্ষদ থেকে এস আলম গ্রুপের প্রভাব সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ব্যাংকটির পুরোনো উদ্যোক্তা ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে ফিরে আসেন। এরপর থেকে ন্যাশনাল ব্যাংক ধারাবাহিক তারল্য সংকটে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিকবার ব্যাংকটিকে জরুরি সহায়তা দিয়েছে।
তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপরই আব্দুল আউয়াল মিন্টুর স্থলাভিষিক্ত হয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবিন। ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ৫৩৯তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে মেহজাবিন ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ছিলেন। জানা গেছে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে থাকতে পারবেন নাÑএমন বিধিনিষেধের কারণে আব্দুল আউয়াল মিন্টু চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এর পরিপ্রেক্ষিতেই নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচন করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবিন গ্রামীণফোন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ এবং ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ার লিমিটেডের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের করার দুর্বল ব্যাংকগুলোর তালিকায় প্রথম সারিতে ছিল আইএফআইসি ব্যাংক। নামে-বেনামে ঋণ বিতরণ করেছিল ব্যাংকটি, যার অধিকাংশ এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. রাফাত উল্লাহ খানের বিরুদ্ধে বেপরোয়া নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, ব্যাংকিং আইন ও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই এসব নিয়োগ তিনি দিয়েছিলেন।
আরও জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান এমডিসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি ও বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে। অভিযোগের বিষয়ে তথ্য ও নথিপত্র সরবরাহ করতে ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান শেয়ার বিজকে বলেন, পর্যবেক্ষক বসানো ব্যাংকগুলোতে বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি লক্ষ করা গেছে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহক ও আমানতকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ওই চার ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে।
এ বিষয়ে ন্যাশনাল ব্যাংক ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকসহ চার ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post