Print Date & Time : 13 January 2026 Tuesday 11:31 am

অনির্দিষ্টকাল ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করবে যুক্তরাষ্ট্র

শেয়ার বিজ ডেস্ক : হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সেইসঙ্গে তারা ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ দেশটির তেল বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করবে। এ বিক্রি শুরু হবে তিন থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল দিয়ে। ভেনেজুয়েলা সরকারের ওপর প্রভাব বজায় রাখতে দেশটির রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ করবে মার্কিন সরকার।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, লাতিন দেশটিতে যেসব পরিবর্তন অবশ্যই ঘটবে, তা পরিচালনার জন্য আমাদের ওই তেল বিক্রির ওপর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিবিসি লিখেছে, ওই তেল বিক্রি করলে আয় হতে পারে আনুমানিক ২৮০ কোটি ডলার। এ থেকে কতটুকু অর্থের ভাগ ভেনেজুয়েলা পাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেছেন, উভয় পক্ষ একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ এক বিবৃতিতে জানায়, ‘তেল বিক্রির বিষয়ে আলোচনা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই চলছে। প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কার্যকর নিয়মের অনুরূপ।’ এর আগে গত মঙ্গলবার সামাজিক মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলা পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রে ‘হস্তান্তর’ করবে, যা বিশ্ববাজারে চলমান মূল্যে বিক্রি করা হবে।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তেল বিক্রির অর্থ যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টে জমা থাকবে, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিয়ন্ত্রণ করবেন। তিনিই ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের সুবিধার্থে এ অর্থ ব্যয় করবেন। মার্কিন কর্মকর্তারা গত বুধবার বলেছেন, তারা ইতোমধ্যে তেল বিপণন শুরুর পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রশাসন তেল বিক্রির জন্য ব্যাংক ও বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে।

দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, বুধবার ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেল নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছার বার্তা দিয়েছেন। ডেলসি বলেছেন, দুই পক্ষের সুবিধার জন্য জ্বালানি নিয়ে সম্পর্ক স্থাপনে তিনি উন্মুক্ত। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, দেশটির সব প্রাকৃতিক উৎস যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনা ও দেশটির তেল বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সমালোচনা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। নিজ দেশে ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনা করছেন। দেশটির কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের সিনেটর ক্রিস মারফি এটিকে ‘উন্মাদনা’ বলে অভিহিত করেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, রিপাবলিকান বন্দুকের মুখে অনির্দিষ্টকালের জন্য ভেনেজুয়েলার তেল চুরির কথা বলছে। এজন্য তারা দেশটির নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার যুক্তি দেখাচ্ছে। এ পরিকল্পনার পরিধি ও উন্মাদনা একেবারেই বিস্ময়কর।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং অনির্দিষ্ট কাল ধরে তেল বিক্রি চালিয়ে যাওয়ার আশার কথা জানিয়েছেন। গত বুধবার সন্ধ্যায় তিনি বলেন, তার প্রত্যাশা, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে এবং বছরের পর বছর ধরে এর বিশাল মজুত থেকে তেল উত্তোলন করবে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের যা কিছু প্রয়োজন, তারা তা দিচ্ছে।’

ট্রাম্পের এ মন্তব্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কথা বলার কয়েক ঘণ্টা পরই এলো। এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলা নিয়ে কংগ্রেস সদস্যদের জন্য তিন পর্যায়ের পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন। রিপাবলিকান আইন প্রণেতারা প্রশাসনের পদক্ষেপকে ব্যাপক সমর্থন করলেও ডেমোক্র্যাটরা বুধবারও সতর্কীকরণ পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, স্পষ্ট আইনি কর্তৃত্ব ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র কতদিন আধিপত্য বজায় রাখবে, তার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি। এটি কি তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর, নাকি আরও দীর্ঘ হবে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি আরও অনেক বেশি বলব।’

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প অভিবাসন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গ্রিনল্যান্ড, ন্যাটো, তার স্বাস্থ্য, হোয়াইট হাউস সংস্কারের পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন। তবে মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে কেন ভেনেজুয়েলার নতুন নেতারূপে স্বীকৃতি দিয়েছেন, সে প্রশ্নের জবাব দেননি। ডেলসির সঙ্গে কথা বলেছেন কি না—জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। ট্রাম্প বলেন, ‘মার্কো (রুবিও) সর্বদা তার সঙ্গে কথা বলেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি আপনাকে বলব, আমরা তার ও প্রশাসনের সঙ্গে ক্রমাগত যোগাযোগ রাখছি।’

পঞ্চাশের দশকের শেষ দিক থেকে ১৯৯৯ সালে হুগো শাভেজ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ছিল। ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় নির্বাচন কখন অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে কোনো জবাব দেননি। নিউইয়র্ক টাইমসের চারজন সাংবাদিক তার সঙ্গে কথা বলার জন্য বসার কিছুক্ষণ পরই ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর সঙ্গে ফোনে কথা বলার জন্য সাক্ষাৎকারটি থামিয়ে দেন। কলম্বিয়াকে তিনি কোকেনের কেন্দ্রস্থল বলে বর্ণনা করেন।

কলটি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্ট নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকদের কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথোপকথন শোনার জন্য ওভাল অফিসে থাকার আমন্ত্রণ জানান। বিষয়টি রেকর্ডের বাইরে রাখার শর্ত দেওয়া হয়। তার সঙ্গে কক্ষে যোগ দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও। কল শেষ হলে তারা দুজন চলে যান।

পেত্রোর সঙ্গে কথা বলার পর ট্রাম্প তার এক সহযোগীকে সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট করতে বলেন, যেখানে উল্লেখ ছিল কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট দেশটির গ্রামীণ এলাকায় থাকা কোকেন মিলের ‘মাদকের পরিস্থিতি ব্যাখ্যার জন্য’ ফোন করেছেন। ট্রাম্প তাকে ওয়াশিংটন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

পেত্রোর সঙ্গে ট্রাম্পের কল প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের যে কোনো হুমকিকে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়। ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, তিনি বিশ্বাস করেন মাদুরো শাসনের শিরশ্ছেদ ওই অঞ্চলের অন্য নেতাদের লাইনে আসতে ভয় দেখিয়েছে।