ওয়াহিদুর রহমান রুবেল, কক্সবাজার : বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কক্সবাজারে তিনটি ট্যুরিজম পার্ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু দীর্ঘ ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও আলোর মুখ দেখেনি এসব ট্যুরিজম পার্ক। এরই মধ্যে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানিয়েছেন, প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার প্রকল্পের তালিকায় নেই। এতে এসব প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প বাতিল করা হলেও ধীরে ধীরে অন্য দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
সরেজমিন সাবরং প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত স্থান পরিদর্শনে দেখা যায়, সাবরং অঞ্চলের প্রকল্পে জমি ভরাট এবং বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের কাজ ছাড়া আর কোনো অগ্রগতি নেই। ভরাট জমির মধ্যখানে একটি ভবন দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও নির্মাণকাজের লক্ষণ চোখে পড়েনি। তথ্য বলছে, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে বাংলাদেশ অর্থনীতি অঞ্চল (বেজা) ২০১৬ সালে কক্সবাজারের টেকনাফ ৯৬৭ একর জমিতে সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, ২৭১ একর জমিতে নাফ ট্যুরিজম পার্ক এবং মহেশখালীর সোনাদিয়ায় ৯ হাজার ৪৬৭ একর জমিতে ইকো ট্যুরিজম পার্ক তৈরির পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। তিনটি প্রকল্পের মধ্যে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণের স্বার্থে অন্তর্র্বর্তী সরকার সোনাদিয়া প্রকল্পটি বাতিল করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে সব পরিষেবা চালু করার কথা ছিল। সর্বশেষ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সাবরং এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন।
অপরদিকে নাফ ট্যুরিজম পার্কটি টেকনাফের নাফ নদীর মাঝখানে অবস্থিত জালিয়ার দ্বীপে প্রস্তাবিত একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল। এর একপাশে বাংলাদেশের নেটং পাহাড় এবং অন্যপাশে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য অবস্থিত। এটি বাস্তবায়ন হলে এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম একচেটিয়া পর্যটন পার্ক। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে পাঁচ তারকা হোটেল এবং ইকো-কটেজ, একটি ঝুলন্ত সেতু, ৯.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কেব্ল কার নেটওয়ার্ক ভাসমান জেটি, শিশু পার্ক এবং ওশেনারিয়াম, ওয়াটার এবং ভাসমান রেস্টুরেন্ট থাকবে। প্রকল্পটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলের মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। কিন্তু সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে কোনো কোম্পানি আগ্রহ দেখায়নি। ফলে প্রকল্পটিও বর্তমানে তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই বলে জানিয়েছে বেজা কর্মকর্তারা। ফলে দীর্ঘ ৯ বছর পেরিয়ে ট্যুরিজম পার্কের ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে অগ্রাধিকার প্রকল্পের তালিকায় সাবরং ট্যুরিজম পার্কটি নেই বলে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। এক সভায় তিনি বলেন, ‘সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক পর্যটনের জন্য একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল। তবে বর্তমানে আমরা পাঁচটি অগ্রাধিকারভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের কাজ করছি; যার মধ্যে সাবরং অন্তর্ভুক্ত নয়। তিনি বলেন, সাবরাংয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন চলছে এবং এটিকে টেকসইভাবে উন্নয়ন করতে হবে। প্রাথমিক গুরুত্ব দেওয়া পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চল ভালো অবস্থানে পৌঁছালে আমরা সাবরংয়ের উন্নয়নে আরও গুরুত্ব দেব।’
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্পকে বেজার অগ্রাধিকার খাতে বিবেচনা করা উচিত। কারণ আমাদের দেশে বিদেশি পর্যটক কম আসে। এ ধরনের এক্সক্লুসিভ পর্যটন পার্ক হলে বিদেশি পর্যটক বাড়বে। যদি পাঁচ হাজার পর্যটক এই জোনে যায়, এর প্রভাব হবে অনেক বড়। এ ধরনের এক্সক্লুসিভ পার্ক উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করতে পারব এবং দেশি পর্যটকরাও নতুন বিনোদনের জায়গা খুঁজে পাবেন। পর্যটন যে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখে, সেটা যতদিন নীতিনির্ধারকদের বোঝানো যাবে না, ততদিন পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার পাবে না। এছাড়া আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন আন্তর্জাতিক মানের এসব পার্ক বাস্তবায়িত হলে পর্যটন খাতে যেমন নতুন দিগন্ত উšে§াচিত হবে, তেমনি লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) ফাউন্ডার সভাপতি এস এম কিবরিয়া বলেন, পর্যটনশিল্প উন্নয়নে যে পরিকল্পনা ছিল তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। অন্যথায় আমরা শুধু যে বিদেশি পর্যটক হারাব তা নয়, দেশীয় ভ্রমণপিপাসুরাও কক্সবাজারবিমুখ হবে। যার প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতেও। একই সঙ্গে এ খাতে বিনিয়োগকারীরাও উৎসাহ হারিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে যত টাকা ব্যয় হয় তা দিয়ে সহজেই একটি পরিবার বিদেশ ভ্রমণ করতে পারে। তাছাড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ। তাই আমি মনে করি, দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান সায়েমা শাহীন সুলতানা বলেন, ‘সাবরং ট্যুরিজম পার্কটি বেজার মাধ্যমে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল। ওখানে আমাদের জমি বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দেয়নি। তাই ওখানে বর্তমানে কী অবস্থায় আমি বলতে পারব না।’
তিনি বলেন, পর্যটন করপোরেশন বাজেট স্বল্পতার মধ্যে পর্যটনশিল্প বিকাশে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। নতুন নতুন জায়গায় পর্যটন সম্প্রসারণ করে নতুন নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। কক্সবাজারের মোটেল লাবণী ও প্রবালে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন অত্যাধুনিক হোটেল নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং শৈবালে বিদেশি বিনিয়োগের চেষ্টা করে যাচ্ছি।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুজহাত ইয়াসমিন বলেন, কোন যুক্তিতে প্রকল্প দুটি অগ্রাধিকার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তা আমি বলতে পারব না। তবে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য আমরা সবসময় কাজ করছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব মেলার আয়োজন হয় তাতে আমরা অংশ নিই। দেশের অভ্যন্তরে বিদেশি মিশনের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। আমরাও বিভিন্ন মেলার আয়োজন করে থাকি। এক কথায় আমাদের কার্যপরিধির মধ্য থেকে যতটুকু কাজ করা দরকার আমরা করে যাচ্ছি। তবে কক্সবাজার নিয়ে আলাদা কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানান তিনি।
প্রিন্ট করুন




Discussion about this post