Print Date & Time : 29 April 2026 Wednesday 12:04 pm

অবৈধ পরিচালনা পর্ষদে চলছে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স

আনোয়ার হোসাইন সোহেল : পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইডিআরএ। গত বছরের ৮ ডিসেম্বর ২০ কার্যদিবসের মধ্যে কোম্পানিটিতে বীমা বিধিমালা লঙ্ঘন করে বেআইনিভাবে ঘোষিত পাঁচ পরিচালককে অপসারণ এবং প্রকৃতভাবে নির্বাচিতদের নিয়োগ দিতে নির্দেশনা দিলেও দুমাস ধরে সেই নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখি আসছে তাকাফুল।

আইডিআরএ জানিয়েছে, গত বছরের ১৬ আগস্ট তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ২৫তম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বীমাকারীর ‘পরিচালক নির্বাচন বিধিমালা ২০২৪’-এর বিধি ১১(২) লঙ্ঘন করে যথাযথভাবে ভোট গণনা না করে উদ্যোক্তা পরিচালক অংশে এবিএম কায়কোবাদ, মো. মাসুদুর রহমান ও তাহমিনা আফরোজ এবং সাধারণ পরিচালক অংশে জিয়া উদ্দিন পোদ্দার ও মো. সাইদুল ইসলামকে অবৈধভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

বিষয়টি তদন্তের জন্য ওই বছরেরই ২৭ আগস্ট নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক অ্যান্ড কোংকে নিয়োগ করে আইডিআরএ। তদন্ত শেষে কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করেছে। প্রতিবেদনে অভিযোগে বর্ণিত বিজয়ী ঘোষিত পরিচালকদের ‘পরিচালক নির্বাচন বিধিমালা ২০২৪’-এর বিধি ১১(২) লঙ্ঘন করে যথাযথভাবে ভোট গণনা না করে অবৈধভাবে পরিচালক পদে বিজয়ী ঘোষণা করার বিষয়টি তথ্য-প্রমাণসহ প্রমাণিত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উপস্থাপিত প্রকৃত ভোটের ফলাফল এবং ঘোষিত ফলাফলে মিলের তফাত পাওয়া গেছে।

নির্দেশনায় প্রকৃত ভোটের সঙ্গে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের ঘোষিত ভোটের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে বলে উল্লেখ করে ভোটের সংখ্যা জানানো হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত ‘পরিচালক নির্বাচন বিধিমালা ২০২৪’ অনুযায়ী প্রাপ্ত প্রকৃত ভোটসংখ্যা উদ্যোক্তা পরিচালক অংশে-আবুল হাশেম ১০,৯৭৩,৩৬০ ভোট; মোহাম্মদ মফিজউদ্দিন ৯,৬৯৫,৭৬৬ ভোট; ফারজানা রহমান ৯,৬৯৫,৭৬৬ ভোট; আনোয়ার হোসাইন চৌধুরী ৯,৬৯৫,৬০০ ভোট; এবিএম কায়কোবাদ ৮,৬৬৯,৩৮০ ভোট; মো. মাসুদুর রহমান ৮,৬৬৯,৩৮০ ভোট; তাহমিনা আফরোজ ৮,৬৬৯,৩৮০ ভোট এবং আনোয়ারুল হক চৌধুরী ৭,৩৯১,৭৮৬ ভোট পেয়েছেন।

তবে বীমাকারী কর্তৃক ঘোষিতপ্রাপ্ত ভোট সংখ্যা উদ্যোক্তা পরিচালক অংশে-আবুল হাশেম ৮,৮১২,৮০৫; এবিএম কায়কোবাদ ৮,৬৫১,৮২০; মো. মাসুদুর রহমান ৮,৬৫১,৮২০; তাহমিনা আফরোজ ৮,৬৫১,৮২০; মোহাম্মদ মফিজউদ্দিন ৭,৫৩৫,২১১; ফারজানা রহমান ৭,৫৩৫,২১১; আনোয়ার হোসাইন চৌধুরী ৭,৫৩৫,২১১ এবং আনোয়ারুল হক চৌধুরী ৭,৩৭৪,২২৬ ভোট পেয়েছেন।

‘পরিচালক নির্বাচন বিধিমালা ২০২৪’ অনুযায়ী প্রাপ্ত প্রকৃত ভোটসংখ্যা জনসাধারণ পরিচালক অংশেনাফিসা সালমা ১০,৯৪১,০৪৯ ভোট (ঘোষিত ফল ৮,৮৬০,৫৪৫), মোহাম্মদ ওসমান গণি ১০,৯৪১,০৪৯ ভোট (ঘোষিত ফল ৮,৮৬০,৫৪৫), জিয়া উদ্দিন পোদ্দার ৯,৪১৬,৫৫৪ ভোট (ঘোষিত ফল ৯,২৯৩,৪২৫), মো. সাইদুল ইসলাম ৯,৪১৬,৫৫৪ ভোট (ঘোষিত ফল ৯,২৯৩,৪২৫) পেয়েছেন।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভোট গণনা করা হলে উদ্যোক্তা পরিচালক অংশে আবুল হাশেম, মোহাম্মদ মফিজউদ্দিন, ফারজানা রহমান ও আনোয়ার হোসাইন চৌধুরী এবং জনসাধারণ পরিচালক অংশে নাফিসা সালমা ও মোহাম্মদ ওসমান গণি বৈধভাবে নির্বাচিত হবেন। তবে বাস্তবে বিধিমালা লঙ্ঘন করে অপেক্ষাকৃত কম ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীদের উদ্যোক্তা পরিচালক অংশে এবিএম কায়কোবাদ, মো. মাসুদুর রহমান ও তাহমিনা আফরোজ এবং জনসাধারণ পরিচালক অংশে জিয়া উদ্দিন পোদ্দার ও মো. সাইফুল ইসলামকে বেআইনিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

আইডিআরএ জানায়, আবুল হাশেম বিধিমালা অনুযায়ী বৈধভাবে নির্বাচিত হওয়ায় তিনি পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবেন। তবে অবৈধভাবে বিজয়ী ঘোষিত পরিচালকরা এখনো পদে বহাল থাকায় এটি বীমা প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, পলিসিধারকদের স্বার্থ, শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ এবং জনস্বার্থের পরিপন্থি বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এ অবস্থায় বীমাকারীর ‘পরিচালক নির্বাচন বিধিমালা ২০২৪’-এর বিধি ১১(১) লঙ্ঘন করে বেআইনিভাবে বিজয়ী ঘোষিত পরিচালকÑউদ্যোক্তা অংশে এবিএম কায়কোবাদ, মো. মাসুদুর রহমান ও তাহমিনা আফরোজ এবং জনসাধারণের অংশে জিয়া উদ্দিন পোদ্দার ও মো. সাইফুল ইসলামকে পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক পদ হতে অপসারণ করে তাদের স্থানে ‘পরিচালক নির্বাচন বিধিমালা ২০২৪’ অনুযায়ী, প্রকৃতভাবে নির্বাচিত উদ্যোক্তা পরিচালক অংশে মোহাম্মদ মফিজউদ্দিন, ফারজানা রহমান ও আনোয়ার হোসাইন চৌধুরী এবং জনসাধারণ অংশে নাফিসা সালমা ও মোহাম্মদ ওসমান গণিকে আগামী ২০ কার্যদিবসের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত করার জন্য ‘বীমা আইন ২০১০’-এর ধারা ৫০(১) অনুযায়ী নির্দেশনা জারি করা হলো।

আইডিআরএ’র নির্দেশনা উপেক্ষা করার বিষয়ে জানতে চাইলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অফিসে আওয়ারের বাইরে আমি এখন কোনো বক্তব্য দিতে পারব না।’

এদিকে তাকাফুন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সচিব মো. শাহীন মিয়া শেয়ার বিজকে বলেন, বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দেওয়া গত ২৭ অক্টোবরের চিঠির বিষয় আমার কোনো আপডেট জানা নেই।

আইডিআরএর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কিছু বীমা কোম্পানি নিজেদের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। একই বিষয়ে একাধিকবার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা গুরুত্ব পাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার মতে, পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে অনিয়ম স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। এতে শুধু কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সুশাসনই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে না, বরং পুরো বীমা খাতের ওপর আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান তাহমিনা আফরোজের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

বীমা খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিচালক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিচালনা পর্ষদই একটি বীমা কোম্পানির নীতিনির্ধারণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব পালন করে। সেখানে যদি ভোটের ফলাফল উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে তা দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানির শর্টটার্ম লোন রয়েছে ১১৬ কোটি টাকা। গতকাল রোববার কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৪২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। সবশেষ কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারদর ছিল ৩৪ টাকা ৪০ পয়সা।

গত ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে পর্যন্ত কোম্পানিটিতে উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছেন ৪৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ, প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ১৯ দশমিক ৮২ শতাংশ, বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৩১ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে শূন্য দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।