নিজস্ব প্রতিবেদক : অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে আগামী সরকারকে বনের হরিণের মতো সতর্ক থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) আলোচকরা।
গতকাল রোববার রাজধানীর বনানীতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) এক সেমিনারে আলোচকরা এসব কথা বলেন। সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর পিআরআইর মাসিক প্রকাশনা ‘মান্থলি ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস’-এর নভেম্বরের প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এ সেমিনারে অর্থনীতিবিদ ও শীর্ষ ব্যবসায়ীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার।
তারা বলেছেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে আংশিক স্থিতিশীলতা ফিরলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ মন্দা ও ব্যাংকিং খাতের চাপ অর্থনীতিকে এখনও ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে। এমন বাস্তবতায় চলতি বছরে অর্থনীতিতে ধাক্কা সামলাতে নীতিনির্ধারকদের বনের হরিণের মতো সতর্ক থাকতে হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান। এতে তিনি বলেন, আগামী সরকারকে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে হলে বনের হরিণের মতো সতর্ক থাকতে হবে। গতকাল যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি এ কথা বলেন। তার মতে, এই ধরনের ঘটনা বিশ্ব পরিস্থিতিতে প্রভাব বিস্তার করে। তাই অর্থনীতি সচল রাখতে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাপনা এবং সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে হবে।
আশিকুর রহমান বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়নি। চলতি বছরে দ্রুত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। বরং বর্তমান বাস্তবতায় অনিশ্চয়তাকেই একটি নির্ধারক বাস্তবতা ধরে সেই অনুযায়ী কৌশল প্রণয়ন করতে হবে।
প্রবন্ধে বলা হয়, ২০২৫ সালের শেষপ্রান্তে এসে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সীমিত অগ্রগতি হয়েছে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তিতে। তবে রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে অগ্রগতি এখনও সীমিত। এই সমন্বয় প্রক্রিয়ার মূল্য হিসেবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে, বিনিয়োগ স্থবির রয়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে এবং প্রকৃত মজুরি হ্রাস পেয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে মন্দা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণ এবং বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতকে তিনি অর্থনীতির মূল সংকট বলে মনে করেন।
ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থা ফেরাতে এমসিসিআই সভাপতি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নীতিগত নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি সামগ্রিকভাবে, অর্থনীতিকে টেকসই করতে সাময়িক সমাধানের পরিবর্তে সুদূরপ্রসারী ও কার্যকর মধ্যমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে ড. জাইদি সাত্তার বলেন, ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন লুটপাট সত্ত্বেও সেই রক্তক্ষরণ থামানো গেছে, যদিও খেলাপি ঋণ প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে; যার একটি অংশ পুনঃশ্রেণিবিন্যাসের ফল। তবুও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় দিক থেকেই সামষ্টিক স্থিতিশীলতা কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়েছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে মূল্যস্ফীতি, যা প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এটি আরও বেশি হতে পারত, যদি সামষ্টিক স্থিতিশীলতা না ফিরত। তবে দুর্বল মুদ্রানীতির কারণে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমছে।
প্যানেল আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন বলেন, অটোমেশনের ক্ষেত্রে এখনও অনেক পিছিয়ে এনবিআর। সেখানে টাকা ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন, যা ব্যবসা-বাণিজ্য বড় বাধা। এ সময় তিনি উচ্চ করপোরেট কর হারের সমালোচনা করেন।
নাসির উদ্দিন বলেন, ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও নানা সহিংসতা অর্থনৈতিক টেকসইকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা ছাড়া প্রবৃদ্ধি ভঙ্গুরই থাকবে। এনবিআর পৃথকীকরণের অধ্যাদেশে দুর্বলতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
