Print Date & Time : 13 May 2026 Wednesday 2:30 am

অর্থনীতি ও উন্নয়ন সম্ভাবনায় বাংলাদেশ

রোদেলা রহমান: বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গত কয়েক দশকে যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর দেশটি ছিল একেবারে যুদ্ধবিধ্বস্ত, অবকাঠামো ভেঙে পড়া এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। সেই অবস্থা থেকে আজকের বাংলাদেশ একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, যা বৈশ্বিক পর্যায়ে ‘উন্নয়নের উদাহরণ’ হিসেবে আলোচিত হয়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তৈরি পোশাকশিল্প। এই খাত দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ভিত্তি। বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ এই খাতে এক বিপ্লব ঘটিয়েছে। গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা নারীরা শহরে এসে কাজ করছে, আয় করছে এবং পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এনেছে।
তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি কিছু গভীর কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এখনও কমদামি শ্রমনির্ভর। এর মানে হলো উৎপাদন খরচ কম হলেও মূল্য সংযোজন (াধষঁব ধফফরঃরড়হ) তুলনামূলকভাবে কম। ফলে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লে ঝুঁকি তৈরি হয়। উন্নত প্রযুক্তি ও অটোমেশন এখনো পর্যাপ্তভাবে শিল্প খাতে প্রবেশ করেনি।
কৃষি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি মূল ভিত্তি। দেশের বড় একটি অংশ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, যা একটি বড় অর্জন। তবে কৃষকের আয় এখনও কম এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। জলবায়ু পরিবর্তন এই খাতকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততাÑসব মিলিয়ে কৃষি ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
অবকাঠামো উন্নয়ন সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো দ্রুত উন্নত হচ্ছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হয়েছে এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বড় বড় প্রকল্প দেশের অর্থনৈতিক আস্থাকে শক্তিশালী করেছে।
তবে এই উন্নয়নের পাশাপাশি কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ, দুর্নীতি এবং খরচ বৃদ্ধি একটি সাধারণ সমস্যা। অনেক সময় উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এছাড়া নগর ও গ্রামের মধ্যে উন্নয়নের ব্যবধান এখনো অনেক বড়।
শিল্পায়নের দিক থেকে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। পোশাকশিল্প ছাড়াও ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উন্নয়ন হচ্ছে। তবে এই খাতগুলো এখনো পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছায়নি। যদি প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বাড়ানো যায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও দ্রুত এগোতে পারবে।
বাংলাদেশের আর্থিক খাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। মোবাইল ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল লেনদেন সাধারণ মানুষের আর্থিক জীবন সহজ করেছে। এখন গ্রামের মানুষও সহজে টাকা পাঠাতে, গ্রহণ করতে এবং সঞ্চয় করতে পারছে। এটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে।
তবে ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতা রয়ে গেছে। খেলাপি ঋণ একটি বড় সমস্যা, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। এটি দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী স্তম্ভ। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কাজ করা বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এই আয় শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকেও সক্রিয় রাখে। অনেক পরিবার এই আয়ের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে।
তবে একটি বড় সমস্যা হলো অর্থনীতির বৈচিত্র্যের অভাব। যদি কোনো একটি খাতে ধাক্কা লাগে, তাহলে পুরো অর্থনীতি প্রভাবিত হতে পারে। তাই শিল্পবৈচিত্র্য বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অনেক বড়। তরুণ জনসংখ্যা দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। যদি এই জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায় প্রযুক্তি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে, তাহলে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী উৎপাদন ও সেবা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি। উপকূলীয় অঞ্চল, কৃষি এবং শহুরে জীবনÑসব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ছে। তাই টেকসই উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিশন পর্যায়ে রয়েছে। একদিকে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন, অন্যদিকে কাঠামোগত দুর্বলতা ও ঝুঁকি। ভবিষ্যতের সাফল্য নির্ভর করবেÑদেশ কীভাবে প্রযুক্তি, মানবসম্পদ এবং নীতিগত সংস্কারকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারে তার ওপর।

গণমাধ্যমকর্মী