নিজস্ব প্রতিবেদক: আর্থিক খাতসহ সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক সেক্টরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না। সরকারের কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ বা প্রভাব এখানে কাজ করবে না, এটি হবে শতভাগ পেশাদার প্রতিষ্ঠান। অর্থনৈতিক খাতকে সরকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখবে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনে আয়োজিত বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসির (বিএসআইসি) প্রথম ফান্ড ‘অঙ্কুর বাংলাদেশ ফান্ড ১’ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক খাত বর্তমানে পেইনফুল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিগত সময়ে ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে কী হয়েছে, সেটা সবাই জানেন। মূলত ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। এজন্য মূলধন জোগান দিতে হবে। এই সমস্যা থেকে বের হতে হবে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের তরুণ প্রজšে§র প্রধান দুটি সমস্যা হলো ফান্ডের অভাব এবং জামানত প্রদানের অক্ষমতা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে এই দুটি বাধা দূর করা হয়েছে। এখানে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, দক্ষ ও পেশাদার।
মন্ত্রী বলেন, এই উদ্যোগটি আমাদের রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। বিশেষ করে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বা সৃজনশীল অর্থনীতির মাধ্যমে গ্রামীণ এবং শহরের তরুণদের অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসা হবে।
আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমরা পুঁজিবাজারের সংস্কার এবং সিরিয়াস ডিরেগুলেশনের দিকে এগোচ্ছি। বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারের জন্য দক্ষ ব্যক্তিদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বড় ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থা আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। দেশের ব্যাংক ও প্রাইভেট সেক্টরের আন্ডার ক্যাপিটালাইজেশন দূর করতে আমরা কাজ করছি।
মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই স্টার্টআপ কোম্পানিটি শুধু ব্যাংক খাতের বিনিয়োগেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে। অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পের সফলতার জন্য সব ধরনের পলিসি সাপোর্ট প্রদান করবে। দেশের অনেকগুলো ব্যাংক একত্রে মিলে এই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, এই বিনিয়োগের সুফল যেন প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণও পায়। কারণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এর বাইরে থাকলে দেশের একটি বড় অংশ বঞ্চিত থাকবে। তিনি বলেন, সামনে আরও একটি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে। ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) সহযোগিতা করবে বলে প্রত্যাশা রাখছি।
বিএসআইসির চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, বিএসআইসি শুধু একটি তহবিল নয়; এটি এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম, যা বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের স্বপ্নকে পেশাদার ও সুশৃঙ্খল মূলধনের সঙ্গে যুক্ত করবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশের ৩৯টি ব্যাংকের উদ্যোগ গড়ে ওঠা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল দেশের স্টার্টআপ খাতে এবার প্রথমবারের মতো দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত হলো। অপরদিকে প্রায় ৪২৫ কোটি টাকার প্রতিশ্রুত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে এই প্ল্যাটফর্ম। এর কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে অংশীদার ব্যাংকগুলো প্রতিবছর তাদের নিট মুনাফার এক শতাংশ এই তহবিলে প্রদান করবে। ফলে এটি কোনো এককালীন তহবিল নয়; বরং একটি ধারাবাহিক মূলধন কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। তহবিলটি সিড, লেট-সিড এবং সিরিজÑএ পর্যায়ের স্টার্টআপে বিনিয়োগ করবে।
তারা জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত উদ্যোগের ফল হিসেবেই এই প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের নিট মুনাফার গত পাঁচ বছরের এক শতাংশ করে এই তহবিলে বিনিয়োগের অনুমতি দেয় এবং বিএসআইসির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত কাঠামো নির্ধারণ করে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে ৪৫০টির বেশি বিনিয়োগ চুক্তির মাধ্যমে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অর্থায়ন এসেছে। তবে এর মধ্যে সাত শতাংশের কম এসেছে দেশীয় উৎস থেকে।
বিএসআইসি জানিয়েছে, ২০২৬ সাল শেষ হওয়ার আগেই তারা প্রথম তিনটি বিনিয়োগ সম্পন্ন করবে। এর আগে তৃতীয় প্রান্তিকের মধ্যে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, একজন প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা এবং পূর্ণাঙ্গ বিনিয়োগ কমিটি নিয়োগ ও গঠন করা হবে।
অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ অঙ্গনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন ভেঞ্চারসুক, ওয়েভমেকার পার্টনার্স (সিঙ্গাপুর), ফাইভ হানড্রেড গ্লোবাল, প্লাগ অ্যান্ড প্লে, এডিবি ভেঞ্চারস, জিএফআর ফান্ড, স্টার্জন ক্যাপিটাল, কনজাংশন ক্যাপিটাল এবং অরবিট স্টার্টআপসের প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রযুক্তিভিত্তিক গণমাধ্যম টেক ইন এশিয়া ও এফডব্লিউডি স্টার্টও অংশ নেয়।

Print Date & Time : 13 May 2026 Wednesday 5:16 am
অর্থনৈতিক খাত রাজনীতির বাইরে রাখতে চায় সরকার
প্রথম পাতা,শীর্ষ খবর ♦ প্রকাশ: