নিজস্ব প্রতিবেদক : স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে আগামী বছরের নভেম্বর মাসে বের হয়ে আসবে বাংলাদেশ। তখন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের থাকবে না অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা। ব্যবসায়ীরা বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে না দেখলেও সরকার এটিকে দেশের সক্ষমতার উদাহরণ হিসেবেই দেখছে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আমরা এলডিসি থেকে উত্তরণের মানদণ্ডগুলো পূরণ করেছি। এখন আর ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সক্ষমতার প্রমাণ ধরেই আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানি আয়ের পথ সুগম রাখতে বিভিন্ন দেশ ও জোটের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ মেয়াদে বাণিজ্য সম্প্রসারণে এফটিও করে সুবিধা আদায়ের পাশাপাশি স্বল্প মেয়াদে জোটটির বাজারে জিএসপি প্লাসে বাড়তি সুবিধা আদায়ে মনোযোগ দেয়ার পরামর্শ বিশ্লেষকদের।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। ইপিবির হিসাবে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৪৪ শতাংশই গেছে ইইউ জোটের ২৭ দেশে, যার পরিমাণ প্রায় ২১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার।
বর্তমানে বিশাল এই বাজারে এভরিথিং বাট আর্মস, অর্থাৎ অস্ত্র বাদে সব পণ্য রপ্তানিতেই শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণের পর আরও তিন বছর থাকবে এই বাণিজ্য সুবিধা।
তবে এরপর কী হবেÑএমন প্রশ্ন তুলে উন্নয়নশীল দেশের তালিকা থেকে বের না হতে ঘোর আপত্তি ব্যবসায়ীদের। ওয়ান ফার্মা ও ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘যে গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে, এর মধ্যেই আমাদের বিভিন্ন রিজিওনাল ট্রিটি এবং দেশভিত্তিক বাণিজ্যিক চুক্তি করতে হবে। কারণ কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি হলে শুল্কহার কী হবে, সেটাও নির্ধারণ করতে হয়। তাই আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয়Ñদু ধরনের এগ্রিমেন্টই এখন অত্যন্ত জরুরি।’
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এখন এমন অবস্থানে আছি, যেখানে উন্নয়নশীল দেশ থেকে উত্তরণের মানদণ্ডগুলো পূরণ করছি। নেপাল ও লাওসের তুলনায় আমাদের অবস্থান আরও ভালো। ২০২৬ সালে আমরা গ্র্যাজুয়েট করব কি নাÑসেই প্রশ্নই ওঠে না, কারণ এখন আর ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, উন্নয়নের পথে এই উত্তরণকে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ ধরেই এগোতে চায় সরকার।
বৈদেশিক বাণিজ্যে বাড়তি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বহুমুখী উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশ ও আঞ্চলিক জোটের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এরই অংশ হিসেবে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের। এরই মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ইইউ প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে তা আরও স্পষ্ট হবে আগামী মাসে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ মেয়াদে শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখতে পারে এফটিএ। তবে স্বল্প মেয়াদে ইউরোপের বাজারে জিএসপি প্লাসে আদায় করতে হবে বাড়তি সুবিধা। ট্রেস কনসালটিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ফুয়াদ এম খালিদ হোসেন বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট ইমপোর্টের মাত্র ছয় শতাংশ হলেও সেই দেশ বা প্রোডাক্টে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ যে পণ্য রপ্তানি করছে, বিশেষ করে রেডিমেড গার্মেন্ট, তা ইউরোপের মোট ইমপোর্টের প্রায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস সুবিধা পুরোপুরি পাবে না।’ এরই মধ্যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) করার বিষয়ে অনেকটা পথ এগিয়েছে বাংলাদেশ
অন্যদিকে ২০২৬ সাল থেকে পিছিয়ে দিয়ে ২০৩২ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ চান শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। তারা এলডিসি উত্তরণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বাড়তি তিন বছর এবং ট্রানজেকশন পিরিয়ড হিসেবে তিন বছর চাচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, এলডিসি থেকে উত্তরণকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে দেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। তবে তারা মনে করে, সফল ও টেকসই উত্তরণের জন্য তিন থেকে পাঁচ বছর অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। তাদের দাবি, এই মুহূর্তে এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে রপ্তানি খাতসহ নানা খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সফল ও টেকসই উত্তরণের জন্য অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছরের অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। বাড়তি সময়ের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আঘাত মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, আসিয়ান জোট এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি নিশ্চিত করা যা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।
এদিকে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) পর্যবেক্ষণ করেছে, ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হচ্ছে। তবে এই উত্তরণ আরও কঠিন অধ্যায়ের সূচনা করবে। এতে দরকার হবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার আরও বেশি সক্ষমতা।
আইসিসিবি’র ত্রৈমাসিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫) বুলেটিনের সম্পাদকীয়তে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে। জাতিসংঘের নির্ধারিত তিনটি সূচক জনপ্রতি ব্যক্তির আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক গুলোতেই সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে দেশটি। ফলে ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উঠতে যাচ্ছে। এই অর্জন আমাদের জন্য এক বিশাল গর্বের বিষয়, যা গত ৫০ বছরের উন্নয়ন, শিল্পের অগ্রগতি ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিফলন।
