নিজস্ব প্রতিবেদক : চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশে আসা প্রতি ১০০ ডলারের ৮৮ ডলার এরই মধ্যে ঋণ ফেরতে ব্যয় হয়েছে, যা দেশের হাতে খুব সামান্য নিট সুবিধা রেখে গেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ বৈদেশিক সহায়তা পরিস্থিতি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই ছয় মাসে দেশে মোট বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে একই সময়ে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। ফলে নিট বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ দাঁড়িয়েছে মোট অর্থছাড়ের মাত্র ১২ শতাংশে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈদেশিক ঋণের বড় অংশই ফেরতের খাতে চলে যাওয়ায় সরকারের অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণসেবার চাপ বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনায় সরকারের নির্বাহী সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়Ñদুটোই কমেছে। এ সময়ে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ১৯৯ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল প্রায় ২৩০ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি কমেছে ১৩ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থছাড়ের পরিমাণ আরও বেশি হ্রাস পেয়ে ২৯ দশমিক ২৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারে।
গ্রান্ট বা অনুদান প্রবাহে পতন সবচেয়ে বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে অনুদান প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল প্রায় ২৯ কোটি ডলার। একই সময়ে ঋণ প্রতিশ্রুতিও কিছুটা কমেছে, তবে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা এখনও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইআরডির তথ্যে দেখা যায়, প্রকল্প সহায়তার বাস্তব অর্থছাড়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে যেখানে প্রকল্প সহায়তা বাবদ অর্থছাড় হয়েছিল ৩ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার, চলতি অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। খাদ্য সহায়তা প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রয়েছে।
অন্যদিকে ঋণসেবার দায় বাড়ছে দ্রুতগতিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে আসল পরিশোধে গেছে প্রায় ১৪৩ কোটি ডলার এবং সুদ বাবদ পরিশোধ হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯৮ কোটি ডলার।
ইআরডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে অর্থনৈতিক চলাচলের পরিসর সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। তার ভাষায়, ‘এ পরিস্থিতিতে স্মার্ট ঋণ গ্রহণ, দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন, জলবায়ু ও মিশ্র অর্থায়নের মতো বিকল্প উৎস কাজে লাগানো এবং ঋণ স্থায়িত্ব আরও শক্তিশালী করা জরুরি।’
ইআরডির কর্মকর্তারা আরও জানান, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘিরে উন্নয়ন সহযোগীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে নীতিগত দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হবেÑএই প্রত্যাশায় অনেক দাতা সংস্থা এখন নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতিতে যাচ্ছে না। নতুন সরকার এলে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় বাড়তে পারে বলে তাদের ধারণা।
সংস্থা অনুযায়ী অর্থছাড়ে বরাবরের মতোই শীর্ষে রয়েছে বিশ্বব্যাংক। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সংস্থাটি ৫৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের বেশি ঋণছাড় করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), যার অর্থছাড় প্রায় ৫২ কোটি ডলার। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান মিলিয়ে ঋণছাড় হয়েছে প্রায় ১২ কোটি ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে উন্নয়ন ব্যয় ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। এজন্য এখনই প্রয়োজন পরিকল্পিত ও টেকসই বৈদেশিক অর্থায়ন কৌশল গ্রহণ।
প্রিন্ট করুন



Discussion about this post