Print Date & Time : 20 May 2026 Wednesday 1:49 pm

অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে আলিফ  ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি

আনোয়ার হোসাইন সোহেল ও নূর হোসেন মামুন: পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড তিন বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে আর্থিক অবনতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে পোশাক খাতের এই কোম্পানিটির রাজস্ব আয় কমার পাশাপাশি নিট মুনাফাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) নিম্নমুখী হয়েছে এবং মুক্ত নগদ প্রবাহও ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। ফলে কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
২০২৩ অর্থবছরে আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের মোট রাজস্ব ছিল ১৮১ কোটি টাকা। পরের বছর ২০২৪ অর্থবছরে তা ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৬০ কোটি টাকায়। আর ২০২৫ এর ৩১ মার্চ পর্যন্ত সর্বশেষ ১২ মাসের হিসাবে কোম্পানিটির রাজস্ব আরও ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটি তার মোট রাজস্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ হারিয়েছে।
স্টক অ্যানালাইসিস ডটকমের তথ্যমতে, আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিটির নিট মুনাফার চিত্রও ধারাবাহিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২২ অর্থবছরে নিট মুনাফা ছিল ১৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৩ কোটি ২ লাখ টাকায়। পরের বছর ২০২৪ অর্থবছরে নিট মুনাফা আরও কমে হয় ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ৩১ মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত কোম্পানিটির নিট মুনাফা নেমে এসেছে ৭ কোটি ২৪ লাখ টাকায়। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে প্রায় ৫২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাময়িক চাপ নয়; বরং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার প্রতিফলন।
আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২২ অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ৫৮ পয়সা। ২০২৩
 সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫০ পয়সায়। পরের বছর ২০২৪ অর্থবছরে ইপিএস আরও নেমে আসে ৩৩ পয়সায় । আর সর্বশেষ ট্রেইলিং টুয়েলভ মান্থস (টিটিএম) হিসাবে ইপিএস দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮ পয়সায়। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব ও মুনাফা কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি ইপিএসে পড়ছে। একই সঙ্গে গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটির মুনাফা গড়ে প্রতিবছর নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে কোম্পানির ইপিএস আরও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কোম্পানিটির গ্রস মার্জিন গত পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২০ সালে যেখানে কোম্পানিটির গ্রস মার্জিন ছিল ২৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ, সেখানে ২০২১ সালে তা নেমে আসে ১৯ দশমিক ০৩ শতাংশে। পরের বছর ২০২২ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশে। এই নিম্নমুখী ধারা ২০২৩ সালেও অব্যাহত থাকে, যখন গ্রস মার্জিন কমে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশে পৌঁছায়। সর্বশেষ ২০২৪ অর্থবছরে তা আরও সংকুচিত হয়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশে। ফলে পাঁচ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির গ্রস মার্জিন ধারাবাহিকভাবে অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। নিট মুনাফার মার্জিন গত পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির নিট মুনাফার মার্জিন ছিল ১৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যা নির্দেশ করে সে সময় বিক্রির তুলনায় লাভজনকতা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। এরপর ২০২১ সালে এই হার কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশে। ২০২২ সালে আরও সংকুচিত হয়ে হয় ৮ দশমিক ৪১ শতাংশ। এই নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থাকে ২০২৩ সালেও, যখন নিট মুনাফার মার্জিন নেমে আসে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশে। ২০২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটির মার্জিন আরও কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৪২ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের টিটিএম হিসাবে এটি সামান্য কমে ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশে অবস্থান করছে। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির নিট মুনাফার মার্জিন প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগের বেশি কমে গেছে।
২০২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটির ফ্রি ক্যাশ ফ্লো ছিল প্রায় ঋণাত্মক ৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, যা টিটিএম (৩১ মার্চ ২০২৫) হিসাবে আরও কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ঋণাত্মক ১১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ২০২১ সালে কোম্পানির হাতে নগদ ছিল প্রায় ৪২ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালে নেমে আসে ১৭ কোটি ৯০ লাখ টাকায়। এরপর ২০২৪ সালে নগদ আরও কমে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকায়। সর্বশেষ টিটিএম ( ৩১ মার্চ ২০২৫) হিসাবে কোম্পানির নগদ অবস্থান নেমে এসেছে মাত্র ২ কোটি ২৬ লাখ টাকায়। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে কোম্পানির নগদ সঞ্চয় প্রায় ৯৫ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে শেয়ারপ্রতি নগদ লভ্যাংশ ছিল ২০ পয়সা , যা ২০২৩ সালে কমে ১০ পয়সায় নেমে আসে। সর্বশেষ এজিএম হয় ২৯ ডিসেম্বর  ২০২৪-এ। গত এক বছরে শেয়ারের দাম ১৬ দশমিক ১৩ শতাংশ কমেছে। ৫২ সপ্তাহের সর্বোচ্চ ছিল ৬ দশমিক ২০ টাকা, বর্তমানে ৫ দশমিক ২০ টাকা। কোম্পানিটি গত এক বছরে বাংলাদেশের সামগ্রিক শেয়ারবাজারের চেয়েও খারাপ পারফরম্যান্স করেছে। বাজার নিজেই বলছেÑ বিনিয়োগকারীরা এই শেয়ারে আস্থা হারাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব পতন, মুনাফা পতন, ঋণাত্মক ফ্রি ক্যাশ ফ্লো, দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া নগদ সঞ্চয়, কমে আসা লভ্যাংশ এবং বাজারে আস্থাহীনতাÑএকসঙ্গে এতগুলো নেতিবাচক সংকেত যে কোম্পানিতে দেখা যায়, সেখানে বিনিয়োগের আগে অত্যন্ত সতর্কতা জরুরি। আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ক্ষেত্রে তথ্য বলছে, কোম্পানিটি এখন গভীর চাপের মধ্যে আছে এবং ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড (আগে কেএমসি-কামাল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড নামে পরিচিত) ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি রপ্তানিমুখী বস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। সাভারের আশুলিয়ায় অবস্থিত কারখানায় কোম্পানিটি মূলত তুলা প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন ধরনের সুতা উৎপাদন করে, যা স্থানীয় স্পিনিং মিল, তাঁতশিল্প এবং তৈরি পোশাক খাতে ব্যবহƒত হয়। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৭ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় এবং বর্তমানে এর শেয়ার ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে লেনদেন হচ্ছে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জেআইটি ইন্টারন্যাশনাল ইনকর্পোরেটেডের কাছে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে কোম্পানির ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন, ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এবং নতুন বিনিয়োগ প্রবাহের সম্ভাব্য উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মো. হানিফ শেয়ার বিজকে বলেন কোম্পানির শেয়ারদর কেন বাড়ছে কমছে এবিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। তবে ওভারঅল মার্কেটই খারাপ যাচ্ছে। ফুয়েল প্রাইস বেশি তা ছাড়া অর্ডার কম, ইনফ্লেশন বেশি সবকিছু মিলিয়ে আমাদের ব্যবসা খুব খারাপ।