তাকবির জাহান : ‘আইন’ শুধু একটি শব্দ বা শুষ্ক বিধান নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ভিত্তি, সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান উপাদান, উন্নয়নের গতি-প্রকৃতিকে নির্ধারণকারী শক্তি এবং নাগরিকের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ ভরসা। যে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত, সেখানে রাষ্ট্রে অঙ্গগুলো সুশাসিতভাবে চলে; মানুষ নিশ্চিন্তে বসবাস করে; উন্নয়ন হয় স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর। কারণ, আইনের সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগই নাগরিকের আস্থা তৈরি করে; যা উন্নয়নের একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি শক্তি। কিন্তু এই আইন তৈরি করে কে? আর এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করে কারা?
সংবিধান অনুযায়ী আইন প্রণয়নের ক্ষমতা একমাত্র জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত। নির্বাহী বিভাগ আইন বাস্তবায়ন করে আর বিচার বিভাগের মূল দায়িত্ব হলো আইন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করা, জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। বিচার বিভাগকে তাই বলা হয় আইনের রক্ষক।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের জন্য বেশকিছু মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে। যেমন—২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান; অর্থাৎ একই পরিস্থিতিতে কারও প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জন্মসূত্র বা অন্য যে কোনো পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে সমসুযোগের কথা বলা হয়েছে, যাতে সকল নাগরিক যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ পান।
এর পাশাপাশি সংবিধান চিন্তা, বিবেক, প্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে; যা নাগরিক জীবনের ভিত্তি।
এসব অধিকার রক্ষার জন্যই বিচার বিভাগের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাস্তবে কি বিচার বিভাগ সেই প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারছে?
সম্প্রতি ১৭তম বাংলাদেশ জুডিশিয়ারি সার্ভিস কমিশন (বিজেএস) পরীক্ষাকে ঘিরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে। কমিশনের সুপারিশে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ১৩ জন যোগ্য প্রার্থীকে চূড়ান্ত গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠোর প্রতিযোগিতা এবং সরকারি কমিশনের সুপারিশ—এসবের পরও যখন পুলিশ ভেরিফিকেশনে অস্পষ্ট কারণ দেখিয়ে তাদের বাদ দেয়া হয়, তখন তা শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়, বরং স্পষ্টভাবে তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন।
দুঃখের বিষয় হলো, এমন ঘটনা শুধু বিজেএসই নয়; অনেক বিসিএস পরীক্ষায় সরকারি চাকরিতে সুপারিশ পাওয়ার পরও অস্পষ্ট, অদৃশ্য এবং অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনার কারণে প্রার্থীদের বঞ্চিত করা হয়। কোনো ফৌজদারি মামলা নেই, চরিত্রগত সমস্যা নেই, আইনগত বাধা নেই; কিন্তু তারপরও চাকরি পায় না। এই ধরনের অন্যায় সিদ্ধান্ত প্রশাসনের প্রতি নাগরিকের আস্থা ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে।
একজন চাকরিপ্রার্থী শুধু একটি চাকরির স্বপ্ন দেখেন না, বরং তিনি একটি পরিবারের প্রতিশ্রুতি, একটি সমাজের প্রত্যাশা এবং নিজের ভবিষ্যতের পথরেখা বয়ে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান।
পিতা-মাতার সঞ্চয়, সময়, পরিশ্রম ও ত্যাগ এক হয়ে দাঁড়ায় সন্তানকে সেই কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছে দিতে। কিন্তু যখন সেই স্বপ্ন অকারণে ভেঙে যায়, তখন হতাশা তাকে গ্রাস করে। অনেকেই মানসিক বিপর্যয়ে ভোগেন, চাকরির প্রস্তুতি ছেড়ে দেন, পরিবার-সমাজে হেয় প্রতিপন্ন হন। অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
কেউ কেউ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। ফলে দেশের মেধা দিন দিন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে?
যখন যোগ্যতা, মেধা ও সততার বদলে রাজনৈতিক পরিচয় বা অদৃশ্য প্রভাব চাকরির ক্ষেত্রে প্রধান হয়ে ওঠে, তখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো দুটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
তাহলে কি আমরা বলতে বাধ্য হবো যে বিচার বিভাগ আজ রাজনীতির বেড়াজালে বন্দি?
স্বাধীন বিচার বিভাগ থাকার পরও যদি ন্যায়বিচার না মেলে, তবে সেই স্বাধীনতা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
উন্নত রাষ্ট্রগুলো দেখিয়েছে যে আইনের সুষম প্রয়োগ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষাই উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। তারা কোনো নাগরিককে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং মানুষের পরিচয়ে মূল্যায়ন করে। আমাদের দেশও যদি সত্যিকারের উন্নয়ন চাই, তাহলে নিয়োগব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ নিয়োগপ্রক্রিয়াকে সময়সীমাবদ্ধ ও যৌক্তিক করতে হবে, বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে, মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, আইনের সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে।
আজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার, অধিকার রক্ষার দাবি জানানোর এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রকৃত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার সময়।
রাজনীতির কারণে যাতে আর কোনো মেধা, পরিশ্রম বা স্বপ্ন নষ্ট না হয়—সে দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ এবং বিচার বিভাগের সবার।
যে রাষ্ট্রে আইন সকলের জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয়, সেই রাষ্ট্রই টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়। এখন প্রশ্ন—আমরা কি সেই পথে হাঁটতে প্রস্তুত?
যদি হই, তবে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী; যদি না হই, তবে উন্নয়নের পথ আরও দীর্ঘ ও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। কারণ এই প্রশ্নের শুধু রাষ্ট্র বা সরকারের কাছে নয়—আমাদের সবার কাছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি একটি সম্মিলিত প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে একটি অভিন্ন মানদণ্ডে পরিচালিত হতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, যোগ্যতা এবং সততা হবে মূল মাপকাঠি। তাহলেই আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে। তাহলেই জাতি আবার স্বপ্ন দেখবে। আমরা মূলত প্রস্তুত তখনই হবো, যখন একজন সাধারণ চাকরিপ্রার্থী বুঝবেন—
‘আমার মেধা ও পরিশ্রমই আমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, কোনো গোপন প্রভাব বা অদৃশ্য শক্তি নয়।’
শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
