আনোয়ার হোসাইন সোহেল : আর্থিক অনিয়মে জর্জরিত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বারবার ঢিলাঢালা অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংকটির প্রতি সহনশীল মনোভাব প্রদর্শন করছে। তারা আরও বলছেন, ক্ষমতাধরদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে ন্যাশনাল ব্যাংক প্রায়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাংকিং খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পুঁজিবাজারের বিধি অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি পরিচালকের ব্যক্তিগতভাবে ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার থাকা বাধ্যতামূলক। তবে এসব নিয়ম মানছে না ন্যাশনাল ব্যাংক।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর প্রভাব থাকায় ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে, যা ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম জানান, কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো প্রতিষ্ঠানের বোর্ড ভেঙে দেয়, তাহলে পরিচালকদের অনুপস্থিতির কারণে শেয়ার ধারণ কম হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে পরিচালকদের ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা নাও থাকতে পারে। তবে কোনো পরিচালক শেয়ার বিক্রি, হস্তান্তর বা দান করলে তা অবশ্যই ডিসক্লোজারের মাধ্যমে জানাতে হবে।
অন্যদিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) উদ্যোক্তা পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, ‘আইন থাকার পরও যদি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে এমন আইন না থাকাই ভালো। এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা ও ব্যর্থতা প্রকাশ করে।’
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা শেয়ার ছিল ১৫.৫৪ শতাংশ। এক মাস পর ফেব্রুয়ারিতে তা আরও ২.১৫ শতাংশ কমে গেলেও কোনো ডিসক্লোজার দেওয়া হয়নি।
জানা গেছে, ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু ও সাবেক পরিচালক জাকারিয়া তাহের বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য।
বর্তমানে ব্যাংকটির শেয়ার কাঠামোয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ৩৮.৫১ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগ ০.৫০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৪৭.৫০ শতাংশ শেয়ার। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটির শেয়ার দর ফেস ভ্যালুর নিচে রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালে পরিচালকদের যোগসাজশে প্রায় ১ হাজার ১৫৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এ ঘটনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ৫৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে এক সময়ের শক্তিশালী এই ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকের তালিকায় চলে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ২০ আগস্ট নতুন বোর্ড গঠন করা হয়।
নতুন বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা হিসেবে জামানত ছাড়াই ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া অন্য ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ৯৮৫ কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়। সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকটি প্রায় ১০ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছে।
তবে এসব ঋণের নির্ধারিত সময় পার হলেও পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংকটি। পরে কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়। পাশাপাশি চলতি হিসাবে ঘাটতি রেখেও লেনদেনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিক বলেন, ‘ন্যাশনাল ব্যাংকের বিষয়গুলো আমাদের নজরে আছে, আমরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছি।’
তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর শেষে ব্যাংকটির আমানত ছিল ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছরে কমে ৩৩ হাজার কোটিতে দাঁড়িয়েছে।
ঋণের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে মোট ঋণ ছিল ৪২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ছিল ২৩ হাজার ৭২২ কোটি টাকা (৫৫.৪৯%)। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৬.২৪ শতাংশ।
এই ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে নগদ আদায় হয়েছে মাত্র ২৪১ কোটি টাকা।
ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতিও দ্রুত বাড়ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে যেখানে ঘাটতি ছিল ১৬ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা, তা ২০২৫ সালের জুন শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা।
একই সময়ে মূলধন ঘাটতি ৫ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮ হাজার ৪৬০ কোটিতে পৌঁছেছে।
বিধি অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ নগদ রিজার্ভ (সিআরআর) এবং ১৩ শতাংশ সহজে নগদায়নযোগ্য সম্পদ (এসএলআর) সংরক্ষণ করতে হয়। তবে ন্যাশনাল ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই এ দুই ক্ষেত্রেই ঘাটতিতে রয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকটি এসএলআর ঘাটতিতে রয়েছে, যা বর্তমানে ৪ হাজার ১০ কোটিতে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে সিআরআর ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৫২ কোটি টাকা।
ন্যাশনাল ব্যাংকের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. কায়সার রশিদ বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের শেয়ার কম থাকলেও তারা শেয়ার ছাড়েননি, বরং হোল্ড অবস্থায় রেখেছেন। বিশেষ পরিস্থিতির কারণে বিষয়টি আপাতত স্থগিত রয়েছে।
৫ আগস্টের পর ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হন দুই ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বÑআবদুল আউয়াল মিন্টু ও জাকারিয়া তাহের সুমন।
আবদুল আউয়াল মিন্টু দেশের একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি। তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মাল্টিমোড গ্রুপ বিভিন্ন খাতে সক্রিয়। এর মধ্যে লাল তীর সিড বিশেষভাবে সফলতা অর্জন করেছে।
অন্যদিকে, জাকারিয়া তাহের সুমন ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
জাকারিয়া তাহের ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও সক্রিয়। তিনি টিএস হোল্ডিংস, পূর্বাচল ড্রিলার্স এবং টিএস প্যাকেজিংয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আরমানা লিমিটেড, আরমানা অ্যাপারেলস, আরমানা ফ্যাশন, আরম্যাক লজিস্টিকস, ডেনিম্যাক লিমিটেড, ডেনিম্যাক ওয়াশিং, জিতা অ্যাপারেলস এবং জিন্স কালচারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post