নিজস্ব প্রতিবেদক : পুঁজিবাজারে আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) শেয়ারের দর নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ভূমিকা রাখবে নতুন জারিকৃত ‘পাবলিক অফার অব ইকুয়িটি সিকিউরিটিজ রুলস, ২০২৫’। এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) প্রতিনিধিরা। গতকাল বুধবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে বিএসইসি ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন সংস্থাটির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম।
নতুন বিধিমালায় আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার বিনিয়োগকারীদের মাঝে বরাদ্দ দিতে লটারি পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে আইপিওতে আসা কোম্পানির শেয়ার লটারির মাধ্যমে বণ্টন করা হবে।
গত ৩০ ডিসেম্বর এই বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এই বিধিমালা সম্পর্কে স্টেকহোল্ডারদের ধারণা দিতে ওই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে বিএসইসি।
সংবাদ সম্মেলনে বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, স্টেকহোল্ডারদের মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হয়েছে এই বিধিমালা। নতুন বিধিমালার মাধ্যমে আইপিও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং শেয়ারদর যৌক্তিক পর্যায়ে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, এই রুলস কোনো একক সিদ্ধান্ত নয়; বরং বাজারসংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়েই এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন বিধিমালার ফলে কৃত্রিম দর প্রস্তাব, কার্টেল গঠন ও প্রাইস ম্যানিপুলেশনের সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক হাসান মাহমুদ, অতিরিক্ত পরিচালক লুৎফুল কবির এবং যুগ্ম পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
মো. আবুল কালাম জানান, আইপিও রুলসের খসড়া প্রকাশের পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১৭০টিসহ মোট ২২০টি মন্তব্য ও প্রস্তাব পাওয়া যায়। প্রতিটি মন্তব্য গুরুত্বসহ পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং তার প্রতিফলন চূড়ান্ত বিধিমালায় দেখা যাচ্ছে। খসড়া ও চূড়ান্ত রুলসের পার্থক্যই প্রমাণ করে, স্টেকহোল্ডারদের মতামত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০০৬ সাল থেকে আইপিও প্রক্রিয়া নিয়ে যে বিতর্কগুলো ছিল, যেমন মেরিট যাচাই, সরেজমিনে পরিদর্শন, স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশ এবং উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে আইপিও করার বাধ্যবাধকতাÑএসব বিষয় নতুন বিধিমালায় পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালায় ইচ্ছামতো শেয়ারদর প্রস্তাবের সুযোগ রাখা হয়নি। সক্ষমতার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত দর প্রস্তাব করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দর প্রস্তাবে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা হবে বলে জানান বিএসইসির মুখপাত্র।
২০২০ সালের সংশোধিত পাবলিক ইস্যু রুলসের সমালোচনা করে মুখপাত্র বলেন, সে সময়ের বুক বিল্ডিং পদ্ধতি কার্যত ফিক্সড প্রাইসের মতো ছিল। নতুন ২০২৫ সালের রুলস পুরোপুরি বাজারনির্ভর ও কার্যকর বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে।
আবুল কালাম আরও জানান, বিএসইসি গঠিত টাস্কফোর্স তিনটি খাত-মিউচুয়াল ফান্ড, আইপিও ও মার্জিন রুলস সংস্কারে গুরুত্ব দেয়। এই তিন ক্ষেত্রেই সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। করপোরেট গভর্ন্যান্স ও অডিটরস প্যানেল-সংক্রান্ত বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
নতুন বিধিমালায় কার্টেল গঠন, কৃত্রিম দর প্রস্তাব ও সক্ষমতার বাইরে দর দেওয়ার মতো কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব অনিয়ম ঠেকাতে ছয়টি নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করা হয়েছে এবং নিয়ম লঙ্ঘনে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে কার্টেলের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করে বলা হয়, একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গোপন সমঝোতার মাধ্যমে বাজার প্রভাবিত করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো বা কমানোই কার্টেল।
বিএসইসি জানায়, অতীতে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে দর নির্ধারণ মূলত দরকষাকষিনির্ভর ছিল, যা বাজারনির্ভর নয় এবং এতে নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতো। এই ঝুঁকি কমাতেই ২০১৫ সাল থেকে ধাপে ধাপে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির দিকে যাওয়া হয়।
নতুন রুলসে ইন্ডিকেটিভ প্রাইস নির্ধারণ আরও কঠোর করা হয়েছে। ইস্যুয়ার ও ইস্যু ম্যানেজারকে ভ্যালুয়েশন পদ্ধতির মাধ্যমে দর যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করতে হবে। পাশাপাশি রোডশোর মাধ্যমে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ যাচাই করে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ চাহিদার ভিত্তিতে দর ভ্যালিডেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এখন শুধু দর প্রস্তাব করলেই হবে না; সেই দামে কত শেয়ার কেনার বাস্তব সক্ষমতা রয়েছে, সেটিও প্রমাণ করতে হবে।
বিনিয়োগকারীদের মতামতে উঠে আসে, আইপিও আবেদনে ‘শেয়ার বাই’ নিয়ম থাকলে তারা ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসানে পড়েন। অথচ সাধারণ আইপিওতে তারা ২০০-৩০০ টাকা লাভ করতে পারেন। তাই এই নিয়ম আবার চালু না করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এছাড়া বিনিয়োগকারীরা ‘হাই নেট ওরথ ইন্ডিভিজুয়াল (এইচএনআই)’ কোটা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, বড় বিনিয়োগকারীরা আগে থেকেই নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবিত কোটা কাঠামো হলো- Others (RB)=60% + NRB=10% + EI=20% + MF=5% + Employee=5%।
তাদের মতে, সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ফিক্সড প্রাইস বা বুক বিল্ডিং উভয় ক্ষেত্রেই আইপিওর মাধ্যমে বাজারে এলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লাভবান হবেন। বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রো-রাটা নয়, লটভিত্তিক লটারি ব্যবস্থার প্রস্তাবও দেন তারা।
বিএসইসির নতুন রুলস অনুযায়ী, ফিক্সড প্রাইস মেথডে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সীমা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে পাঁচ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ, স্থায়ী কর্মীদের জন্য পাঁচ শতাংশ, হাই ভ্যালু ইনভেস্টরের জন্য পাঁচ শতাংশ, এনআরবি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে পাঁচ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটা ৭০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বুক বিল্ডিং মেথডে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য ১০ শতাংশ, স্থায়ী কর্মীদের তিন শতাংশ, হাই ভ্যালু ইনভেস্টরের পাঁচ শতাংশ, এনআরবি বিনিয়োগকারীদের সাত শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৩৫ শতাংশ বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন এই বিধিমালা বাজারে স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর আইপিও ব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে বিএসইসি।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post