ওয়ালিউর রহমান ফরহাদ ও আনোয়ার হোসাইন সোহেল : ‘ক্যানডিডা অরিস’ নামের ওষুধ-প্রতিরোধী ছত্রাক (সুপারবাগ) ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ)। এমনই তথ্য উঠে এসেছে, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায়। প্রতিবেদনের ফলাফল থেকে জানা যায়, এই ‘সুপারবাগ’ ছত্রাকটি এতদিন শুধু নবজাতকের নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) দেখা যেত। কিন্তু এখন গুরুতর অসুস্থ বয়স্ক রোগীদের মধ্যেও এটি সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। এতে হাসপাতালে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ‘ক্যানডিডা অরিস’ কোনো উপসর্গ ছাড়াই ত্বকে অবস্থান (কলোনাইজেশন) করতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি রক্তে প্রবেশ করে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। গুরুতর অসুস্থ রোগী এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের ক্ষেত্রে এ ছত্রাক বেশি ক্ষতিকর। এছাড়া প্রায় সব ধরনের ক্যানডিডা অরিস সাধারণভাবে ব্যবহƒত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হওয়ায় এর চিকিৎসা বেশ কঠিন। এসব কারণে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষ ‘সুপারবাগ’কে গুরুতর স্বাস্থ্যগত হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
আইসিডিডিআরবি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটি ঢাকার দুটি বড় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে পরিচালিত হয়েছে। রাজধানীর মহাখালীতে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সহযোগিতায় এতে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)। ২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৭২ জন আইসিইউ রোগীকে এ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রোগীদের আইসিইউতে ভর্তির পরপরই এবং পরবর্তীতে সেখানে তাদের অবস্থানকালীন সময়ে তাদের ত্বকে ‘ক্যানডিডা অরিস’ রয়েছে কিনা বা রক্তে সংক্রমণ হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়। ত্বক ও রক্তের নমুনা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয় এবং সন্দেহজনক নমুনাগুলো ভিটেক-২ পদ্ধতিতে নিশ্চিত করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউতে থাকার কোনো একপর্যায়ে প্রায় ৭ শতাংশ রোগীর শরীরে সি.অরিস পাওয়া গেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সুপারবাগ রোগীদের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি আইসিইউতে থাকার সময়ই ছত্রাকে সংক্রমিত হয়েছেন, যা থেকে বোঝা যায় যে এই সংক্রমণ মূলত হাসপাতাল থেকেই ছড়িয়ে পড়ছে।
এছাড়া দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালে এই হার বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেশি। সরকারি হাসপাতালে প্রায় ১৩ শতাংশ রোগী আইসিইউতে থাকার সময় সি.অরিসে আক্রান্ত হয়েছেন, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে এই হার ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। এর মাধ্যমে এই দুটি হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পার্থক্যের বিষয়টিও উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে তুলনা করলে, ঢাকার আইসিইউগুলোতে পাওয়া এই হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। কানাডা ও সংযুক্ত আরব-আমিরাতের মতো উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে পরিচালিত গবেষণায় সাধারণত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম হারে এই ছত্রাকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
যেসব রোগীর শরীরে এই ছত্রাক পাওয়া গেছে তারা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। আইসিইউতে দীর্ঘদিন অবস্থান করেছেন এবং তাদের জন্য মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন বা সেন্ট্রাল ও ইউরিনারি ক্যাথেটারের মতো ইনভেসিভ চিকিৎসাপদ্ধতির প্রয়োজন হয়েছে। এসব পদ্ধতি অনেক সময় জীবনরক্ষাকারী হলেও যথাযথ পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুনাশের ব্যবস্থা না থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, সব সি.অরিস জীবাণু ফ্লুকোনাজলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী এবং একটি বাদে প্রায় সব জীবাণুই ভরিকোনাজলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী, অর্থাৎ জীবাণু ধ্বংসে কাজ করছে না। এগুলো সাধারণত প্রথম ও দ্বিতীয় সারির অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ হিসেবে ব্যবহƒত হয়। আবার কিছু জীবাণু একাধিক ওষুধের বিরুদ্ধে অকার্যকর ছিল। এতে এসব সংক্রমণের চিকিৎসা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে। এ বিষয়টি অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ ব্যবহারে উন্নত দিকনির্দেশনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে।
আইসিডিডিআর,বির ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের এএমআর রিসার্চ ইউনিটের প্রধান এবং এ গবেষণার প্রধান গবেষক ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, ‘এই গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, ক্যানডিডা অরিস শুধু গুরুতর অসুস্থ নবজাতকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সব ধরনের আইসিইউ পরিবেশের জন্যই একটি বড় হুমকি। আমরা হাসপাতালের ভেতরেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছি এবং সচরাচর ব্যবহƒত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ দেখতে পাচ্ছি। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা, নজরদারি উন্নত করা এবং চিকিৎসা আরও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা এখন অত্যন্ত জরুরি।’
নির্বাচিত কিছু নমুনার জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইসিইউগুলোতে পাওয়া সি.অরিস মূলত দক্ষিণ এশীয় ধরনভুক্ত। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, এই ছত্রাক এখন এ অঞ্চলে স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে। এটি বাইরের দেশ থেকে আসা কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়।
গবেষকরা হাসপাতালের বিভিন্ন স্থান নিয়মিত ও যথাযথভাবে ক্লোরিনভিত্তিক কার্যকর জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করা এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ইউনিটগুলোয় নিয়মিত স্ক্রিনিং চালুর সুপারিশ করেছেন, যাতে সংক্রমিত বা জীবাণুবহনকারী রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়। পাশাপাশি অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের সংযত ও যুক্তিসংগত ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও তারা গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে কার্যকর চিকিৎসার সীমিত বিকল্পগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়। গবেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন, ঢাকা শহর ও সারা দেশে সমস্যাটির বিস্তৃতি ভালোভাবে বোঝার জন্য আরও বেশি হাসপাতালে বড় পরিসরের গবেষণা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক মঈনুল আহসান শেয়ার বিজকে বলেন, রোগটির বিস্তৃতি আরও বিষদভাবে বুঝার জন্য আমরা বাংলাদেশের আরও কয়েকটি হাসপাতালে গবেষণা শিগগিরই শুরু করব এবং ছত্রাকবিরোধী এই সুপারবাগ রোগটি প্রতিকারে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে কার্যকর পদক্ষেপ নেব।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post