মেট্রোরেল ঢাকাবাসীর কাছে কেবল একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়; এটি সময় বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার প্রতীক এবং যানজটক্লিষ্ট রাজধানীর জন্য এক ধরনের স্বস্তির নাম। কিন্তু সেই প্রতীক যখন প্রতিদিনের ভোগান্তির উৎসে পরিণত হয়, তখন প্রশ্ন উঠতে বাধ্য আমরা কি সত্যিই প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তুত? রাজধানীর বিভিন্ন মেট্রোরেল স্টেশনে টিকিট ভেন্ডিং মেশিনের ঘন ঘন কারিগরি ত্রুটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; এটি নগরজীবনের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করছে এবং মানুষের আস্থাকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করছে।
এই ভোগান্তির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও নারী যাত্রীরা। যারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্লাস বা অফিসে পৌঁছাতে বাধ্য, তাদের জন্য আধা ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানে শুধু সময়ের ক্ষতি নয়, বরং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। সময়মতো ক্লাসে পৌঁছাতে না পারা, লেকচার মিস হওয়া, পরীক্ষার আগে অতিরিক্ত মানসিক চাপ—এসবের পেছনে টিকিটিং ব্যবস্থার এই দুর্বলতা বড় ভূমিকা রাখছে।
নারী যাত্রীদের জন্য পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। ভিড়ের মধ্যে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা শুধু অস্বস্তিকর নয়, অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নও তোলে। আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—নারী, শিশু ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ নিশ্চিত করা। অথচ মেট্রোরেলের মতো একটি উন্নত পরিবহন ব্যবস্থায় টিকিট কাটতেই যদি নারী যাত্রীদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে বড় ধরনের ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা।
সমস্যাটি কেবল যাত্রী ভোগান্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে। টিকিটিং ব্যবস্থার অচলাবস্থার কারণে অনেক যাত্রী বিকল্প হিসেবে উবার, সিএনজি বা রিকশার মতো ব্যয়বহুল পরিবহন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে প্রতিদিন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মূলত প্রযুক্তির ব্যর্থতা নয়, বরং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন। একটি প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করাই যথেষ্ট নয়; সেটিকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত বিকল্প ব্যবস্থা এবং সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মেট্রোরেল একটি দেশের উন্নয়ন দর্শনের অংশ। এটি কেবল ইস্পাত, কংক্রিট বা ট্রেনের সমন্বয় নয়; এটি মানুষের সময়, আস্থা ও জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যাত্রী, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ, অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের অভিন্ন দাবি একটাই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান। তা না হলে মেট্রোরেল সময় বাঁচানোর প্রতীক না হয়ে ধীরে ধীরে নতুন এক ভোগান্তির নাম হয়ে উঠবে, যার বোঝা বইতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
প্রিন্ট করুন




Discussion about this post