এফ আই মাসউদ : বাজারে চলমান সংকট নিরসনে আমদানি পর্যায়ে এলপি গ্যাসের ভ্যাট ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। গতকাল বৃহস্পতিবার এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে এ চিঠি পাঠানো হয়েছে।
‘এলপি গ্যাস আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও ট্যাক্স পুনর্নির্ধারণ’ শিরোনামের চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদার ৯৮ শতাংশ বেসরকারি কোম্পানি আমদানি করে, যার অধিকাংশ শিল্প খাতসহ গৃহস্থালি কাজে ব্যবহƒত হচ্ছে। সাধারণভাবে শীতকালে বিশ্ববাজারে এবং দেশে এলপি গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় দাম বাড়ে। তাছাড়া শীতকালে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহও অপেক্ষাকৃত কম থাকায় এলপি গ্যাসের চাহিদা বাড়ে। বর্তমানে এসব কারণে বাজারে এলপি গ্যাসের তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং জনজীবনে এর প্রভাব পড়েছে।
এতে আরও বলা হয়, সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে এ সংকট নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এসপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলওএবি) নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় এলপি গ্যাসকে গ্রিন ফুয়েল বিবেচনায় এর আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও ট্যাক্স পুনর্নির্ধারণ করার বিষয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে গত ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের কার্যবিবরণীর ১৩নং আলোচনার উদ্ধৃতি নিম্নরূপÑ‘অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এলপি গ্যাসের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহারপূর্বক ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে আরোপিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট, ব্যবসায়ী পর্যায়ের ভ্যাট এবং আগাম কর অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব প্রণয়ন সময়োপযোগী। তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজি কেনা বাবদ কী পরিমাণ ব্যয় হ্রাস পাবে তা বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। এজন্য জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ সমন্বিত পর্যালোচনাপূর্বক পুনরায় প্রস্তাবটি উপদেষ্টা পরিষদ বৈঠকে উপস্থাপন করা সমীচীন।’
উপদেষ্টা পরিষদের এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব আংলাদেশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থাপন করা হয়। সভায় বিস্তারিত আলোচনায় এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে ঐকমত্য পোষণ করা হলেও উপস্থিত এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা আমদানি পর্যায়ে প্রণীত ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের বিপরীতে শূন্য শতাংশের দাবি করেন। যদিও উপদেষ্টা পরিষদের আলোচনার সঙ্গে এলপিজি অপারেটররা ঐকমত্য পোষণ করেছেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
এ অবস্থায় বাজারে এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উল্লেখিত সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক বর্তমান সংকট বিবেচনায় নিয়ে আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার করে তা ১০ শতাংশের নিচে নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে আরোপিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট, ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট এবং আগাম কর অব্যাহতি প্রদানের বিষয়ে উপদেষ্টা পরিষদের আলোচনার সঙ্গে একমত হয়েছে। এ অবস্থায় এ বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এনবিআর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।
এদিকে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের চিঠিটি হাতে পেলেও শুল্ক কমানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
এনবিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা আল আমিন শেখ শেয়ার বিজকে বলেন, আমি খোঁজখবর নিয়েছি। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয় বিক্রির ক্ষেত্রে কমিশন বৃদ্ধি, বিইআরসির একতরফা দাম ঘোষণা বন্ধ করাসহ ছয় দফা দাবিতে এলপিজি ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘট। এমন প্রেক্ষাপটে জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসির সঙ্গে বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন এলপিজি ব্যবসায়ীরা।
তবে এলপিজি সংকটে সপ্তাহজুড়ে চলা গ্রাহক ভোগান্তি গতকাল ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণে চরমে পৌঁছায়। আগে থেকে প্রস্তুতি না থাকায় রান্না বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় নিম্ন ও
মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক বাসায়। সিলিন্ডার গ্যাস না পেয়ে বৈদ্যুতিক চুলা অথবা কাঠের চুলায় রান্নার কাজ সারতে দেখা গেছে অনেক পরিবারকে।
অর্থ ও বাণিজ্যবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) জাকির হোসেন নামে এক নেতা জানান, শুক্রবার আমাদের সংগঠনের এজিএম। বৃহস্পতিবার বাজারে গিয়ে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে ১ হাজার ৩০০ টাকার সিলিন্ডার ২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। দুটি সিলিন্ডারের দাম পড়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। বাজারে সিলিন্ডার সংকট।
ধর্মঘটের কারণে সিলিন্ডার সংকট দেখা গেছে হোটেল-রেস্তোরাঁতেও। গণমাধ্যমকর্মী নুরুন্নাহার কলি থাকেন বাসাবোতে। তিনি জানান, দুপুরের পর নাস্তা খাওয়ার জন্য রেস্টুরেন্টে গেলে হোটেল কর্তৃপক্ষ জানায় সিলিন্ডার সংকটের কারণে রান্না করতে পারিনি।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান জানান, অপারেটরদের কাছ থেকে সিলিন্ডার কিনতেই তাদের এক হাজার ৩০০ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে। তাই ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার দেড় হাজার টাকার কম দামে বিক্রি করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
বৈঠকে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আশ্বস্ত করেন, চলমান অভিযানের বিষয়ে তারা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন ও চার্জ বাড়াতে আইনগত পদক্ষেপ নেবেন।
জালাল আহমেদ বলেন, এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন জানিয়েছে, জাহাজ সংকটের মধ্যেও পণ্য আমদানির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহের সংকট কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জানান, জানুয়ারি মাসের জন্য নির্ধারিত এক হাজার ৩০৬ টাকার বেশি দামে পণ্য বিক্রির কোনো যুক্তি তিনি দেখছেন না।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post