চিররঞ্জন সরকার : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন,
“শেষ কহে, ‘একদিন সব শেষ হবে,
হে আরম্ভ, বৃথা তব অহংকার তবে।’
আরম্ভ কহিল, ‘ভাই, যেথা শেষ হয়
সেইখানে পুনরায় আরম্ভ-উদয়।’’
জীবনের আসল শিক্ষা হলো—কোথায় থামতে হবে সেটা জানা, আর কোথা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে, সেটা বোঝা। কিন্তু আমরা বেশির ভাগ মানুষই তা জানি না। জানলেও মানি না। আমরা এমন জাতি, যে লালবাতি জ্বললেও ভাবে ‘ইটুকু এগোলে কী-ই বা এমন ক্ষতি হবে!’ তারপর ট্রাফিক পুলিশ বাঁশি বাজালে বলি, ‘আচ্ছা, একটু তো’ এই ‘একটু’-ই একদিন বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একবার সংগীতজ্ঞ দিলীপ কুমার রায় মহাশয় সুপ্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়কে কোনো এক জলসা শুনতে যাওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করতে থাকেন। শরৎচন্দ্র দিলীপ কুমারকে বললেন, না ভাই, ওসব উচ্চাঙ্গ গান-টান আমি বুঝি না, তুমিই যাও। দিলীপ কুমার নাছোড়বান্দা। কেবল বলতে থাকেন, দাদা, এ সে রকমের জলসা নয়। ঘরোয়া ব্যাপার, সেখানে যে গায়কটি আসবেন তিনি একজন খুব উঁচু দরের গুণী, আপনি তার গান শুনলে মোহিত হয়ে যাবেন। চমৎকার গান, একবারটি শুনেই আসবেন, চলুন। শরৎচন্দ্র সব শুনে একটু চিন্তিতভাবে বলে উঠলেন, ‘হুঁ, তুমি যা বলছ দিলীপ, সবই বুঝলুম, গুণী লোক, গানও গায় ভালো, কিন্তু থামে তো?’
দিলীপ কুমারসহ উপস্থিত সবাই শরৎচন্দ্রের এ কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন, কিন্তু শরৎচন্দ্রের এই প্রশ্নটি হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। গান যেমন সুরে শুরু হয়, তেমনি সুরেই শেষ না হলে তা আর সংগীত থাকে না, শুধু শব্দের হট্টগোল হয়ে যায়।
আমরা অর্থাৎ বাঙালিরা অনেক কিছু শিখেছি, কিন্তু কোথায় থামতে হয় সেটাই শিখিনি। আমাদের গান থামে না, বক্তৃতা থামে না, কথা থামে না, উপদেশ থামে না, ধর্মীয় বয়ান থামে না, গালাগালি তো থামতেই চায় না, এ এক মরণজ্বালা। বাসের সহযাত্রী যদি একবার গল্প শুরু করে, তবে গন্তব্যে এসে গেলেও গল্পের স্টপেজ আসে না। ফোনে একবার ‘আচ্ছা রাখছি’ বললে রাখি না, আরও দশ মিনিটের রেশন কথা অবশ্যম্ভাবী।
আমরা ছোটবেলা থেকে উপদেশ শুনতে আরম্ভ করলাম তা আর থামল না। গুরুজনেরা আমাদের ভালো করবার জন্য এত উপদেশ বিতরণ করলেন যে, সব করণীয় কাজ ভুলে গেলাম। এ যেন সরকারের নিত্যনতুন আইন পাস ও তা অনুসরণের নির্দেশ, সব ধারা মুখস্থ থাকলে ভালো উকিল হওয়া যায়, টেলিভিশনের টকশোতে ডাক পাওয়া যায়, আর তা না হলে আহাম্মক পাবলিকের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে হয়। এই কর না, তাই কর না, এই কর, তাই কর—বলতে বলতে আমাদের আর কোনো কিছু করতে হলো না, একেবারে কাজের বাইরে চলে গেলাম! তারা যদি উপদেশ একটু স্বল্পমাত্রায় দিতেন, উপকার হতো। মাত্রা বাড়াতেই বিপদ হয়ে গেল। ওভারডোজ আমাদের হজম হলো না, ঠিক যেমন বেশি মিষ্টি খেলেও শেষে তেঁতো লাগে।
এদের পর আরম্ভ হলো মাস্টার সাহেবদের উপদেশ। তারপর অফিসের কর্তাদের, তারও পরে বন্ধুদের। সর্বশেষ বাড়ির লোকদের। কেউ কখনও থামলেন না। এদের সবার নজর এড়িয়ে একটু ড্রইংরুমে নিঃসঙ্গ বসে টিভি দেখবেন? সেখানেও ‘সর্ববিষয়ে জ্ঞানীদের’ নিয়মিত উপদেশ বর্ষণের ঠ্যালায় মাথা-টাথা সব গুলিয়ে যাবে! রিমোট হাতে নিয়েও স্বাধীন নন-চ্যানেল বদলালেই শুরু হয় নতুন উপদেশের বন্যা।
কাজকর্ম, সমাজ-সংসার সব ত্যাগ করে ধর্মঘট তো আর করা যায় না! তাতে রাজনীতিকদের জীবন চলে; কিন্তু আমাদের মতো খেটে-খাওয়া মানুষের জীবন চলে না! আমাদের করে খেতে হবে, লড়ে যেতে হবে! কিন্তু এই লড়াইয়েও যদি থামার জায়গাটা না জানি, তাহলে লড়াই একদিন নিজের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে যায়।
অথচ কারোর জীবনেই কোনো দুর্ভোগ হয় না, যদি যথাস্থানে থামার আর্টটা সকলের জানা থাকে। গরগর করে হম্বিতম্বি পর্যন্ত ভালো, কিন্তু হুট করে কারও নাকে ঘুষি বসিয়ে দিবেন না কখনও, তা হলেই সর্বনাশ। প্রতিপক্ষকে কখনও কিলের ওজন বুঝতে দিতে নেই। বাকযুদ্ধ করে, মুখে মুখে যত খুশি রাজা-উজির মারুন, কেল্লা ফতে করুন, কিন্তু খবরদার নিজে থেকে কখনও সত্যি যুদ্ধ করতে যাবেন না, মারা পড়বেন। কিন্তু মজা এমন যে একবার পরিপূর্ণ আবেগ এলে তার বেগকে ঠিক তালমাফিক থামাবার কায়দা দেশবাসীর জানা নেই। রাগ মানুষের জন্য, মানুষ রাগের জন্য নয়, এ কথাটা আমরা পরীক্ষায় লিখেছি ঠিকই, জীবনে প্রয়োগ করিনি।
জ্ঞানী-গুণীরা বলেছেন, আরও এগিয়ে চল বাবা, থেমো না। আমরাও যতসব বিদঘুটে ব্যাপারের দিকে এগিয়েছি। অনেক ব্যাপারে থেমে যাওয়াটা যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয়, এটা আমাদের দেশে কে কাকে বোঝাবে? শিক্ষিত-অশিক্ষিত কেউই তা বোঝেন না। বক্তা বক্তৃতা দিতে উঠলেন। বিশেষ অধ্যাপক বা কাগজের সম্পাদক হলে তো কথাই নেই, থামবার নাম করবেন না!
লোকে অতিষ্ঠ হয়ে প্রথমে মেঝেতে পা ঘষল, তারপর ঘনঘন বেমক্কা জায়গায় করতালি দিতে শুরু করল, আসনের অর্ধেক খালি হয়ে গেল, তবু হুঁশ নেই। পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞান শ্রোতাদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়ে তবে তিনি মহাপ্রস্থান করবেন। ভবিষ্যতে আর কোনো লোক এসে যে দুটো জ্ঞানের কথা বলে আপনার মাথার ফাঁক ভরাট করে যাবেন, সে সুবিধা তারা দেবেন না!
মনের শক্তি অনেক। কিন্তু থামার শক্তি অনন্ত। মনের চলা তো শুরু হয় থামতে পারার সামর্থ্য অর্জনের পর থেকে। থামা মানে একেবারে থেমে থাকা নয় কিছুটা নিয়ন্¿ণ এবং তারপর আবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতে শুরু করা। ‘থামতে পারি’ মানে লক্ষ্য অতিনিকটে। যেমন নদীর স্রোত বাঁধ দিলে শক্তি কমে না, বরং বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী হয়, ঠিক তেমনি মনও থামার পর আরও শক্তিশালী হয়।
থামা মানেই হলো নীরবতার প্রতি সমর্পণ। এক শিক্ষাগুরু তার শিষ্যদের থামতে শেখাতেন। হয়তো নাচ-গান হচ্ছে, হঠাৎ তিনি বলতেন, ‘থামো!’ যে যেভাবে আছে, সেভাবে থেমে যেত। কিছুক্ষণ পর আবার বলতেন, ‘আরম্ভ।’ সঙ্গে সঙ্গে আবার নাচ-গান শুরু হতো। এতে ছন্দপতন হতো না, আসলে নতুন ছন্দ তৈরি হতো। অনুসারী বা শিষ্যদের নিয়ে চলার পথে তিনি প্রতিনিয়ত কিন্তু হঠাৎ ‘থামা’র অনুশীলন করতেন যাতে জীবনেও তারা ভাঙার আগে থামতে শেখে।
নিজে থামার মাধ্যমে আমরা থামিয়ে দিতে পারি পুরো জগৎ। জ্ঞানপ্রাপ্তির সময় নাকি জগৎ থেমে যায়। হাঁটছি পথ ধরে—হঠাৎ ঝাঁকি দিয়ে থেমে যাই। দৌড়াচ্ছি—হঠাৎ থেমে যাই। কথা বলছি—হঠাৎ থেমে যাই। গাড়ি হঠাৎ থেমে গেলে যেমন ঝাঁকি লাগে, তেমনি হঠাৎ চলা থামিয়ে দিলে মনেও একটা ঝাঁকি লাগে। ধীরে ধীরে থামলে মন থামার জন্য প্রস্তুতি নেয়। হঠাৎ থেমে গেলে ‘মন’ও থেমে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। আর যদি কখনো মন থেমে যায়, তবে থেমে যাবে জগৎ।
থামা নিয়ে এত কথা বলার উদ্দেশ্য হলো: আমরা দেখছি, কিছু মানুষ শুরু করতে জানেন, কিন্তু থামতে জানেন না। তাদের চলার বেপরোয়া গতি অন্যের ক্ষতির কারণ হলেও তারা থামতে চান না। কোনো কিছুতেই সীমা লঙ্ঘন করা উচিত নয়। সীমা ছাড়ালে বা বাড়াবাড়ি করলে সেটা শুধু নিজের জন্যই খারাপ হয় না, অন্যেরও বিপদ-বিপাকের কারণ হতে পারে, যেমন নদীর বাঁধ ভাঙলে শুধু গ্রামের নয়, পুরো জনপদের সর্বনাশ হয়।
যথাসময়ে যথাস্থানে থামতে না জানলে পরিণতি কী হয়, তার প্রমাণ আমরা অতীতে নানা ঘটনায় দেখেছি। তার পরও আমরা কেউ কিছু শিখছি না! ইতিহাস যেন আমাদের বারবার একই ক্লাসে ফেল করাচ্ছে, আর আমরা সেই পরীক্ষায় বারবার ফেল করছি।
চতুর্দিকে আমাদের এত বিপদ ঘনিয়ে আসছে কেন? কারণ আমরা থামতে জানি না। নাচ, গান, বক্তৃতা, গলাবাজি, হুজুগ, মিথ্যাচার, পরচর্চা, আন্দোলন, শোভাযাত্রা, টকশো, গোলটেবিল বৈঠক, শোকসভা, গালাগাল—কিছুই বাদ পড়ছে না! অবাধ, নিরঙ্কুশ, স্বাধীন ও অশ্রান্তভাবে একটা বিষয় নিয়েই অবিরাম মোচ্ছব চালিয়ে যাচ্ছি—থামবার নাম নেই আমাদের।
কিন্তু থামা দরকার। রসিক মাত্রই কোথায় থামতে হয়, ঠিক জানেন। ঈশ্বরকে বলা পরম রসিক। তার প্রমাণ—যথাসময়ে তিনি আমাদের নাচন-কুঁদন ও আস্ফাালনকে একেবারে জন্মের মতো থামিয়ে দেন!
তবে থামিয়ে দেওয়ার চেয়ে নিজে নিজে যে থামতে জানেন, সেই প্রকৃত বিচক্ষণ বা জ্ঞানী। হায়, এমন বিচক্ষণ বা জ্ঞানী মানুষ আমরা কোথায় পাব?
লেখক: কলামিস্ট
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post