Print Date & Time : 20 May 2026 Wednesday 10:39 am

আমাদের গবেষকদের দেশে ফেরানোর উপায় কী?

হাসান শিরাজি: আনিস (ছদ্মনাম) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দারুণ রেজাল্ট নিয়ে যখন ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপ পেয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান, তখন তার চোখেমুখে ছিল বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। গত আট বছরে সেখানে তিনি পিএইচডি শেষ করেছেন, কাজ করছেন নামকরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে। তার নামে পেটেন্ট আছে, আন্তর্জাতিক জার্নালে তার লেখা প্রবন্ধ ছাপা হয় নিয়মিত। প্রতি বছর ঈদে যখন দেশে ফোন করেন, মায়ের কাছে আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ‘মা, আর কয়েকটা দিন। সব গুছিয়ে একেবারে দেশে ফিরে আসব।’
কিন্তু আনিস ফেরেন না। তার মতো হাজারো মেধাবী গবেষক, বিজ্ঞানী এবং পিএইচডি হোল্ডাররা প্রতি বছর বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন এবং আর ফিরে আসছেন না। মাটির টানে তারা হয়তো ফিরতে চান, কিন্তু আমরা কি সেই মাটি তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি?
খুব সহজ ভাষায় বললে, একজন গবেষকের প্রধান খাদ্য হলো ‘গবেষণার পরিবেশ’, যখন একজন স্কলার দেশে ফেরার কথা ভাবেন, তখন তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, গবেষণায় বাজেটের অভাব, আর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার চিত্র। পশ্চিমা বিশ্বে যেখানে তাদের ল্যাবগুলো কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতিতে ভরপুর, সেখানে দেশে ফিরে হয়তো তাকে এমন একটি ডেস্কে বসতে হবে, যেখানে একটি সাধারণ পরীক্ষার সরঞ্জাম কিনতেও মাসের পর মাস ফাইলের পেছনে ছুটতে হয়।
আমাদের দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বা ‘নলেজ-বেইজড ইকোনমি’ গড়ে তুলতে হলে এই মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই।
‘মেধাবীরা দেশে ফিরতে চান না, এমন নয়। বরং তারা দেশে ফিরে নিজেদের মেধার অপচয় হতে দিতে চান না।’ এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে নীতিনির্ধারকদের এখনই কিছু বাস্তবমুখী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে বুঝতে হবে, শুধু আবেগ দিয়ে কাউকে আটকে রাখা যায় না; প্রয়োজন পেশাদারি এবং সঠিক মূল্যায়ন।
বাজেটে শুধু থোক বরাদ্দ দিলে হবে না। এই মেধাবীদের জন্য একটি আলাদা ও স্বাধীন তহবিল গঠন করতে হবে। যারা বিদেশ থেকে পিএইচডি করে দেশে ফিরবেন, তারা যেন দেশে এসেই একটি ‘স্টার্ট-আপ রিসার্চ গ্রান্ট’ পান, যা দিয়ে তারা নিজেদের ল্যাব বা গবেষণার কাজ শুরু করতে পারেন। এই তহবিলের অনুমোদন প্রক্রিয়া হতে হবে স¤‹ূর্ণ আমলাতন্ত্রমুক্ত এবং দ্রুতগতির।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই রাজনৈতিক পরিচয় বা সুপারিশ মেধার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। এই প্রথা ভাঙতে হবে। যারা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে আসছেন, তাদের জন্য ‘স্কেশাল রিক্রুটমেন্ট ড্রাইভ’ বা বিশেষ নিয়োগের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাদের দক্ষতা ও প্রকাশনার ভিত্তিতে সরাসরি যোগ্য পদে বসানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সবাইকে একেবারে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য করার দরকার নেই। অনেকেই আছেন যারা বিদেশের ল্যাবের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান। নীতিনির্ধারকদের উচিত এমন একটি নিয়ম চালু করা, যেখানে একজন গবেষক বছরের কয়েক মাস বাংলাদেশে এবং বাকি সময় বিদেশে তার ল্যাবে কাজ করতে পারবেন। এতে করে বিদেশের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের দেশের সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে।
আমাদের দেশের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে গবেষণায় বিনিয়োগে উৎসাহী করতে হবে। সরকার এখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারে। ট্যাক্স মওকুফ বা প্রণোদনার মাধ্যমে কো¤‹ানিগুলোকে বোঝাতে হবে, যেন তারা দেশি গবেষকদের দিয়ে নিজেদের প্রোডাক্ট বা সেবার উন্নয়ন করায়।
একজন গবেষক যখন দেখবেন তার কাজের সরাসরি প্রয়োগ হচ্ছে এবং সেখান থেকে তিনি আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছেন, তখন তিনি নিজ থেকেই দেশে ফিরবেন।
আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে একজন গবেষককে যেন ফাইলের পেছনে দৌড়াতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাদের কাজ গবেষণা করা, ক্লার্কের কাজ করা নয়। তাদের জন্য এমন একটি কাজের পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা নিজেদের কাজের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সম্মান পাবেন।
গল্পের সেই আনিস হয়তো আজও তার ল্যাবে বসে বাংলাদেশের কোনো খবরের কাগজ পড়েন। হয়তো ভাবেন, ইশ! যদি দেশে এমন একটা ল্যাব থাকত!
আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, এই ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধা পাচার রোধ করা শুধু ইটের পর ইট গেঁথে বিল্ডিং বানানোর চেয়েও বেশি জরুরি। আমরা যদি এখনই এই মেধাবীদের জন্য দেশের দরজাটা সহজ এবং সম্মানজনকভাবে খুলে না দেই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজšে§র কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। আসুন, শুধু আবেগের গল্প না শুনিয়ে, তাদের ফেরার পথটা মসৃণ করি। শেকড়টা শক্ত হলে গাছ এমনিতেই আকাশ ছোঁবে।