Print Date & Time : 16 May 2026 Saturday 12:27 am

আমাদের শিক্ষকদের জন্য একটি নতুন লড়াই

হাসান শিরাজি: রহমত আলী সাহেব ৩০ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়াচ্ছেন। তার ক্লাসে পিনপতন নীরবতা থাকে। ব্ল্যাকবোর্ডে চকের ঘষ-ঘষ শব্দ আর তার গম্ভীর কণ্ঠস্বরই ছিল জ্ঞানের একমাত্র উৎস। কিন্তু হঠাৎ একদিন পৃথিবী থমকে গেল। ক্লাসরুমের চকের জায়গা নিল জুম আর গুগল মিট। চকচকে সাদা ডাস্টারের বদলে এলো ল্যাপটপের স্ক্রিন।
রহমত সাহেব সেদিন অসহায় বোধ করেছিলেন। তিনি জানতেন আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের প্রতিটি সমীকরণ, কিন্তু ‘শেয়ার স্ক্রিন’ বা ‘আনমিউট’ বাটনটি তার কাছে মনে হয়েছিল এক জটিল গোলকধাঁধা। আমাদের দেশের অনেক অভিজ্ঞ এবং প্রবীণ অধ্যাপক আজ এই একই সংকটে, যাকে আমরা সম্মানের সঙ্গে ‘ওল্ড গার্ড’ বা প্রবীণ শিক্ষক সমাজ বলি, এডটেক বা শিক্ষা-প্রযুক্তির এই জোয়ারে তারা কিছুটা যেন থমকে দাঁড়িয়েছেন।
সমস্যাটা মেধার নয়, সমস্যাটা অভ্যাসের। আমাদের শিক্ষকরা যে পদ্ধতিতে পড়ে এবং পড়িয়ে বড় হয়েছেন, সেখানে প্রযুক্তি ছিল গৌণ। এখনকার শিক্ষার্থীরা ‘ডিজিটাল নেটিভ’, তারা স্মার্টফোন হাতে নিয়ে বড় হয়েছে; অন্যদিকে শিক্ষকদের জন্য এটি একটি স¤‹ূর্ণ ভিন্ন ভাষা। এই ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তিগত সাক্ষরতার অভাব কেবল শিক্ষকদের পিছিয়ে দিচ্ছে না, বরং শিক্ষার মানেও একটা ব্যবধান তৈরি করছে।
শুধু শিক্ষকদের দোষ দিয়ে বা তাদের ওপর প্রযুক্তির বোঝা চাপিয়ে দিলেই সমাধান আসবে না। নীতিনির্ধারকদের বাস্তবমুখী কিছু পদক্ষেপ নিতে হবেÑ
সহজ ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ: বছরে একবার কোনো সেমিনার করে প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়া সম্ভব নয়। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত ‘হ্যান্ডস-অন’ ট্রেনিং বা হাতে-কলমে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
সহায়ক মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম: প্রতিটি বিভাগে তরুণ শিক্ষকদের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, যাতে তারা প্রবীণ শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত সমস্যায় বড় ভাইয়ের মতো সাহায্য করেন। এতে প্রজšে§র মধ্যকার ব্যবধানও কমবে।
অবকাঠামোগত সহায়তা: ল্যাপটপ বা উচ্চগতির ইন্টারনেট কেনা অনেক শিক্ষকের জন্য ব্যয়বহুল হতে পারে। সরকারকে বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সুদমুক্ত ঋণ বা অনুদানের মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিগত ডিভাইসের ব্যবস্থা করতে হবে।
শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন: কেবল অনলাইনে ক্লাস নেওয়া মানেই এডটেক নয়। কীভাবে ইন্টারঅ্যাক্টিভ পদ্ধতিতে সøাইড তৈরি করা যায়, কীভাবে অনলাইন কুইজ নেওয়া যায়, সেগুলো পাঠ্যসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।
ভয় দূর করার পরিবেশ: প্রযুক্তি ব্যবহারে ভুল করাটা স্বাভাবিক। কোনো শিক্ষক যেন টেকনিক্যাল ভুলের জন্য উপহাসের শিকার না হন, সেই মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
একজন অভিজ্ঞ অধ্যাপক যখন তার দীর্ঘ বছরের জ্ঞানকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে মেলাতে পারবেন, তখন সেটি হবে এক অপরাজেয় শক্তি। রহমত সাহেবরা যদি একবার জুমের বাটন বা পাওয়ারপয়েন্টের এনিমেশন আয়ত্ত করতে পারেন, তবে আমাদের শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।
প্রযুক্তি কেবল তরুণদের জন্য নয়, প্রযুক্তি সবার জন্য। আমাদের প্রবীণ শিক্ষকদের হাত ধরে আমরা যেন একটি ডিজিটাল কিন্তু অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। সময়ের দাবি এটাই।