Print Date & Time : 30 April 2026 Thursday 9:15 pm

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ১৪ ডিসেম্বরের প্রভাব

 মো. ফজলুল হক : বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমাদের আক্ষেপ অনেক। বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করে আমাদের শিক্ষার অবস্থা দেখে আমাদের লজ্জার অন্ত থাকে না। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণমান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলো। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এইচএসসি পাস শিক্ষার্থীদের গড় জ্ঞান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাত্র সপ্তম শ্রেণির সমতুল্য। উচ্চশিক্ষার হিসাব করলেও খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই আমরা।

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বহু বিদ্যাচর্চার প্রতিষ্ঠানকে বলে বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় মানে হচ্ছে বিশ্বময় বিদ্যালয়, যার পড়াশোনা ও পাঠদান কোনো কিছুই নির্দিষ্ট কোনো স্থান-কাল-পাত্র, সিলেবাস বা‌ বিষয়বস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এখানে যারা পাঠদান করবেন, তারা হবেন অধ্যাপক অথবা পোস্ট-ডক্টরেট ব্যক্তি। যারা শুধু জ্ঞানের সরবরাহকারী নন, বরং তারা জ্ঞান তৈরির পথিকৃৎ। তৈরি করা একটা ফর্মুলা শিক্ষা দেওয়ার বিপরীতে তারা নতুন ফর্মুলা তৈরি করার শিক্ষা দেবেন।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংজ্ঞার সঙ্গে আমাদের অনেক দূরত্ব। আমাদের ক্লাসরুমগুলোয় এখনও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখা হয়। যেখানে উৎসুক এবং কৌতূহলী প্রশ্নের কোনো জায়গা থাকে না। ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীরা মৌখিক বিদ্যার দিকে বেশি ধাপিত হয়, শিক্ষকদের বলা কথাগুলোই অক্ষরে অক্ষরে মুখস্থ করে লিখে এলেই শিক্ষকরা খুশি হয়ে সর্বোচ্চ মার্ক দেন।

আমরা অনুকরণপ্রিয় জাতি—প্রযুক্তি কিনি, ব্যবহার করি, আপডেট করি; কিন্তু কখনোই এটার মেকানিজম নিয়ে আকর্ষিত হইনি। শুধু ভোগ করেই গেলাম, সৃষ্টির দিকে নজর দেওয়া আর হয়ে উঠল না। জানার আকুল আকাঙ্ক্ষা থেকেই না উপায় হবে! কিন্তু প্রশ্নই তৈরি না হলে আবিষ্কার কীভাবে হবে? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এই কিওরিসিটিকে শক্ত হাতে দমন করা হয় ক্লাসরুমে। একটা প্রশ্ন উত্থাপিত হলে সেটাকে যথাযথভাবে ব্যাখা করার জন্য দরকার দক্ষ শিক্ষক। অন্যথায় এই কিউরিসিটি যেমন অকালে মারা যাবে, তেমনি হারিয়ে যাবে আবিষ্কার। যেই দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি আমরা উপলব্ধি করি।

জাতি হিসেবে শিক্ষা ক্ষেত্রে এই ভঙ্গুরতা আমাদের খুব আগের নয়, অনেকটাই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের বিজয়ের হাসিতে দগ্ধ ঘা ১৪ ডিসেম্বর, যেদিন বিজয়ের আড়ালে লিখিত হয়েছিল এ দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়, যার ক্ষতি এখনও পূরণ করা যায়নি, ভবিষ্যতেও যাবে না। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে পাকিস্তানি বাহিনী যখন বুঝতে শুরু করে যে, তাদের পক্ষে যুদ্ধে জেতা সম্ভব নয়, তখন তারা নবগঠিত দেশকে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে দুর্বল এবং পঙ্গু করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। সে অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বর রাতে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দেশীয় দোসরদের সহায়তায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিজ নিজ গৃহ থেকে তুলে এনে হত্যা করে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শুরু হওয়া যুদ্ধে শুরুতে শত্রুবাহিনীর লক্ষ্যবস্তু ছিল বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস করা। বিশেষ জায়গাগুলোয় বিদ্রোহ দমন করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং এই ক্ষেত্রে বাধা দিলে অস্ত্র প্রয়োগ করা। দীর্ঘ ৯ মাস চলা এই যুদ্ধের শেষ দিকে এসে যখন বুঝতে পেরেছে, বাঙালিকে অস্ত্রে দমন করা সম্ভব নয় এবং শিগগিরই এ দেশ ছেড়ে দিতে হবে, তখন তারা স্থাপনাগত ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করে বুদ্ধিভিত্তিক পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিকল্পনা করে। ডিসেম্বরের শুরু থেকেই আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা চলতে থাকে, পাশাপাশি শেষ আঘাত হানার জন্য তারা ১৪ ডিসেম্বরকে বেছে নেয়।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, এই দিনে শিক্ষক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, লেখক, সাহিত্যিকসহ দুই শতাধিক প্রগতিশীল মানুষদের ঢাকা শহরের নিজ নিজ গৃহ থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, সাহিত্যিক মুনির চৌধুরী, অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সাংবাদিক সেলিনা পারভীন, গীতিকার ও সুরকার আলতাফ মাহমুদ এবং পরবর্তী সময়ে জহির রায়হান। যাদের কিছু লাশ পরবর্তী সময়ে রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে পাওয়া গেছে। অনেকের লাশ শনাক্ত করা যায়নি এবং কতিপয় মানুষের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কী হতো যদি সেদিন এই গুণীজনরা বেঁচে থাকতেন? বাংলাদেশ আরও উন্নত, দক্ষ ও পরিকল্পিতভাবে পথ চলতে পারত। হয়তো আবিষ্কারে-উদ্ভাবনে এগিয়ে যেত বাংলাদেশ, হয়তো নিজস্ব প্রযুক্তির গৌরব থাকত আমাদের। কিন্তু একটা কালরাত আমাদের এই সম্ভাবনাগুলোকে পূর্ণ করতে দেয়নি।

একটা দেশ দাঁড়াতে সবচেয়ে জরুরি বস্তুগুলোর ভেতর একটি হচ্ছে বুদ্ধিভিত্তিক স্তম্ভ, যার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকবে বস্তুগত স্থাপনা। চিন্তা ও পরিকল্পনা উন্নত না হলে স্থাপনার উন্নতি সম্ভব হয় না। আমাদের সেই চিন্তার জায়গাগুলো কেড়ে নেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা ও সৃষ্টিশীল চর্চায় যারা একটা জাতিকে নতুন পথে পরিচালিত করবে, যাদের সূক্ষ্ম দিকনির্দেশনায় এগিয়ে যাবে একটি জাতি, তাদেরই হত্যা করা হয়েছিল চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুদিন আগে। বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি একটি জাতির উন্নতির জন্য কতটা জরুরি, সেটা আমরা এত দিনে বুঝতে শিখেছি। সেদিনের ২০০ বুদ্ধিজীবী বেঁচে থাকলে বছরে তাদের মাধ্যমে লাখ লাখ দক্ষ ও চিন্তাবিদ, যোগ্য শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক বের হতো। পরম্পরায় দক্ষ প্রশিক্ষকের থেকে শিক্ষা পেয়ে তারা নিজেরাও হয়ে উঠত আরো একজনের ভালো শিক্ষক। কিন্তু সেই অগ্রগতিতে ভাটা পড়ে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে।

একজন শিক্ষক হচ্ছেন এমন এক মানুষ। তিনি পথ ও জ্ঞানপিপাসু পথিক তৈরি করেন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে। কোনো শিক্ষার্থী যদি ভালো একজন শিক্ষকের সাহচর্য পায়, তাহলে সেও একসময় ভালো জায়গায় যেতে পারে, ভালো কিছু করতে পারে। যদিও তার ভেতরে সম্ভাবনা কিছুটা কম থাকে। পক্ষান্তরে, একজন যোগ্য শিক্ষকের অভাব একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকেও তার মেধার যথাযথ ব্যবহার হতে বিরত রাখে। একজন ভালো শিক্ষকের কাজ একটা সমস্যার সমাধান করে দেওয়া নয়, বরং সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়, সেটা শিখিয়ে দেওয়া। এতে পরবর্তী সময়েও কীভাবে সমস্যার সমাধান করতে হবে, সেটা রপ্ত হয়ে যায়। যুদ্ধপরবর্তী দেশটা যে ২০০ অভিজ্ঞ বুদ্ধিজীবী দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে যোগ্য ও দক্ষ করে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারতেন, তাদের হত্যা করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে চিরতরে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই ক্ষতি কখনও পূরণ হবে না জেনেও আমাদের দায়িত্ব হলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে এতটুকু দায়িত্ববান হওয়া, যাতে বাংলাদেশে এই বুদ্ধিবৃত্তিক ঘাটতি যতটুকু সম্ভব পূরণ করা যায়। স্মৃতিতে তাদের অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রেখে যাওয়া স্মৃতি আমাদের আগামীর পথচলার পাথেয় হয়ে থাকুক। বিজয়ের হাসিতে বুদ্ধিজীবী হত্যার ক্ষত দূর করে একটা শিক্ষিত জাতি গড়ে উঠতে মুক্তবুদ্ধিচর্চার ও গবেষণামুখী শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প নেই।

শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর