দেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের উত্থান এক সময় ধর্মপ্রাণ গ্রাহকদের আস্থার প্রতীক ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অর্থ লুটপাট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং শরিয়াহ নীতির অসম্পূর্ণ প্রয়োগের কারণে এখন এই খাত চরম সংকটের মুখে। সম্প্রতি দুর্বল হয়ে পড়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তর করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই ব্যাংকের নাম ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’। ব্যাংকগুলো হলো-এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। এরইমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করেছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’-এর আমানতকারীরা ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের আমানতের ওপর কোনো মুনাফা পাবেন না। এই সিদ্ধান্ত শরিয়াহ নীতির নামে নেওয়া হলেও আমানতকারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার ঘটেছে, যা ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক আস্থা নষ্ট করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ১৯৮০-এর দশকে শুরু হয়ে এখন মোট ব্যাংকিংয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ স্থান দখল করেছে। যা সুদহীন লেনদেন, লাভ-লোকসান ভাগাভাগি এবং ঝুঁকি সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতিতে গ্রাহকদের আকর্ষণ করেছে। কিন্তু বাস্তবে এই শরিয়াহ নীতি কতটা কঠোরভাবে পালিত হয়েছে তা নিয়ে প্রথম থেকেই তীব্র বিতর্ক চলে আসছে। অনেক ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে ‘মুনাফা’ ঘোষণা করে চলে এসেছে, যা কেবল সুদের ছদ্মবেশ বলে সমালোচিত হয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে এস আলম গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে এসব ব্যাংকে অস্বাভাবিক ঋণ বিতরণ, অর্থ পাচার এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। যার কারণে পাঁচটি ব্যাংকের মিলিত খেলাপি ঋণ প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে গেছে যা তাদের পূর্বের আমানতের তুলনায় অনেকগুণ বেশি। এই সংকট মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে নতুন ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি করে তুলেছে। তবে আমানতকারীদের জন্য এটি স্বস্তির খবর নয় বরং নতুন অনিশ্চয়তার সূচনা।
বাংলাদেশ বাংকের নির্দেশে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত তাৎক্ষণিক ফেরত দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তার বেশি হলে প্রতি তিন মাস অন্তর এক লাখ করে দুই বছর ধরে তোলা যাবে, এবং স্থায়ী আমানতের ক্ষেত্রে তোলা আরও জটিল। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংক দুই বছরের সমস্ত মুনাফা ‘হেয়ারকাট’ করে শূন্য করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ বাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক ব্যাংক লোকসানে থাকলে আমানতকারীরা মুনাফা পান না,’ এবং এটি শরিয়াহ সুপারভাইজরি কাউন্সিলের পরামর্শে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখানে মূল প্রশ্ন উঠছেÑযখন এই ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে এবং নিয়মিত মুনাফা ঘোষণা করেছে, তখন কোথায় ছিল এই শরিয়াহ নিয়ন্ত্রণ? শরিয়াহ বোর্ডের সদস্যরা কি লুটপাট এবং অস্বাভাবিক ঋণের অনুমোদন দিয়েছিল? বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দেন যে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ে লাভ-লোকসান ভাগাভাগি থাকলেও বাস্তবে এটি প্রায়ই প্রচলিত সুদের মতো নির্দিষ্ট হারে পরিচালিত হয়েছে, যা শরিয়াহবিরোধী। এখন লোকসানের পুরো দায় নিরীহ আমানতকারীদের ওপর চাপানো হচ্ছে, যাদের হাতে কোনো দোষ নেই এবং যারা শুধু আস্থার ভিত্তিতে টাকা জমা দিয়েছিল।
এই সিদ্ধান্তের ফলে গ্রাহকদের ক্ষোভ যৌক্তিক। একজন আমানতকারী খন্দকার হাফিজুর রহমানের মতো অনেকে বলছেন, ‘গতবছর আমানত তুলতে গেলে ব্যাংক টাকা দিতে পারেনি, এখন দুই বছর পরে এসে জানানো হচ্ছে কোনো মুনাফা মিলবে না এটা জুলুম এবং ব্যাংকের ব্যর্থতার ফল।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া তীব্রÑফেসবুকে লোকেরা রাস্তায় নামার আহ্বান জানাচ্ছে এবং মনে করছে যে, মুনাফা নির্ধারণের সময় শরিয়াহ ঠিকমতো মানা হয়নি, কিন্তু লোকসানের দায়ে হঠাৎ শরিয়াহর দোহাই দেওয়া দ্বৈত আচরণ এবং আস্থাহানির কারণ। এই অবিশ্বাস শুধু ইসলামী ব্যাংকিং নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করতে পারে, বিশেষ করে ধর্মীয়ভিত্তিক গ্রাহকদের মধ্যে যাদের সংখ্যা প্রচুর।
এই ঘটনার প্রভাব আরও বিস্তৃত। ইতোমধ্যে অনেক গ্রাহক তাদের টাকা প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখায় স্থানান্তর করছে, যেখানে মুনাফা হার বেশি এবং নিয়ন্ত্রণ কঠোর। সম্মিলিত ব্যাংকের শেয়ার মূল্য শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে, যা শেয়ারহোল্ডারদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সরকারের ২০ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের মূল টাকা রক্ষা করলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যবস্থাপনামূলক সংস্কার জরুরি। আমানতকারীদের জন্য ঋণ সুবিধা (জমার ২০-৮০ শতাংশ), বয়স্ক বা গুরুতর রোগীদের বিশেষ ছাড় রয়েছে, কিন্তু এগুলো অস্থায়ী সমাধান মাত্র।
এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। শরিয়াহ সুপারভাইজরি কাউন্সিলকে স্বাধীন এবং কার্যকর করে তুলতে হবে যাতে লুটপাটের শুরুতেই বাধা দেওয়া যায়। ইসলামী ব্যাংক কোম্পানি আইন চূড়ান্ত করে লাভ-লোকসানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, এবং আমানতকারীদের ক্ষতি পূরণের জন্য পৃথক তহবিল গঠন করতে হবে। দোষী ব্যবস্থাপক এবং লুটেরাদের শাস্তি এবং ডিজিটাল ট্রেসিং, ব্লকচেইনের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ স্বচ্ছ করা জরুরি। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক যদি সফল হয় তাহলে ইসলামী ব্যাংকিং পুনরুজ্জীবিত হতে পারে, কিন্তু শরিয়াহর নামে গ্রাহকদের ক্ষতি চাপালে আস্থা চিরতরে নষ্ট হবে। সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে দ্রুত কাজ করতে হবে, নয়ত ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বিপন্ন হয়ে পড়বে। আমানতকারীরা শুধু টাকা ফেরত চান না, তারা ন্যায়বিচার চান এবং শরিয়াহ যদি ন্যায়ের ধর্ম হয়, তাহলে সেটা প্রমাণ করার সময় এসেছে।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post