মো. শাহিন আলম : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত বিশ্বের মোড়ল ছিল গ্রেট ব্রিটেন। লন্ডন ছিল বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্র, পাউন্ড স্টার্লিং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি এতটাই বিস্তৃত ছিল যে বলা হতো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না। কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম বাঁকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে সেই সাম্রাজ্যবাদী কাঠামো ভেঙে পড়ে। এই ভাঙনের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় নতুন মোড়ল; যুক্তরাষ্ট্র।
যুদ্ধ শুরু হলে নাৎসি জার্মানির আগ্রাসনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কেঁপে ওঠে। হিটলারের বোমাবর্ষণে লন্ডন বিধ্বস্ত হতে থাকে, ইউ-বোটে সমুদ্রপথ বিপর্যস্ত হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হলেও, যুদ্ধ তাকে বাধ্য করে কঠোর বাস্তববাদী কূটনীতিক হতে। চার্চিল বুঝে যান, যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে না পেলে ব্রিটেনের পতন অবশ্যম্ভাবী। এই বাস্তবতাতেই আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ প্রিন্স অব ওয়েলস-এ চার্চিল ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি. রুজভেল্টের ঐতিহাসিক বৈঠক হয়। তিন দিনের আলোচনার ফলাফল আসে আটলান্টিক চার্টার (১৯৪১)। রুজভেল্ট স্পষ্ট শর্ত দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে সর্বাত্মক সহায়তা দেবে, তবে যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশগুলোকে স্বাধিকার দিতে হবে। চার্চিলের সামনে তখন দুটি পথ, শর্ত না মানলে হিটলারের হাতে গোটা সাম্রাজ্য হারানো, আর শর্ত মানলে যুদ্ধ জিতে ধীরে ধীরে সাম্রাজ্য হারানো। চার্চিল দ্বিতীয় পথ বেছে নেন। বাস্তবে এটি ছিল ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ থেকে মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত নব্য-উপনিবেশবাদের রূপান্তরের মুহূর্ত।
যুদ্ধ চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র চালু করে লেন্ড-লিজ অ্যাগ্রিমেন্ট, যার মাধ্যমে অস্ত্র, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহের বিনিময়ে মিত্ররা মার্কিন ঋণে জর্জরিত হয়। যুদ্ধ শেষে ব্রিটেন সামরিকভাবে বিজয়ী হলেও অর্থনৈতিকভাবে পরাজিত হলো। চার্চিল নিজেও পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতা হারান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তখন বিশ্বের একমাত্র অক্ষত শিল্প ও আর্থিক শক্তি। এই শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয় ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস সম্মেলনে। ২২ দিনের আলোচনায় জন্ম নেয় আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভিত্তি। এখানেই ডলারকে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার আসনে বসানো হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ ও সদ্য স্বাধীন দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো এই মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই ঋণ ছিল শর্তসাপেক্ষ নিয়ন্ত্রণ। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের নীতির মূল কথা রাষ্ট্রকে সীমিত করো, খাত বেসরকারিকরণ করো, বাজার উন্মুক্ত করো। দরিদ্র দেশগুলোর নিজস্ব শিল্প না থাকায় সুযোগ নেয় বহুজাতিক কোম্পানি। দেশীয় শিল্প ধ্বংস হয়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়, ঋণ শোধ না হয়ে বরং বাড়তে থাকে। এই নীতিমালাই পরবর্তীতে ওয়াশিংটন কনসেনসাস নামে পরিচিত হয়, যা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করে। নব্বইয়ের দশকে কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ হওয়া এই নীতির বাস্তব উদাহরণ।
এই অর্থনৈতিক আধিপত্যের প্রধান অস্ত্র ছিল মার্কিন ডলার। ডলারের বিপরীতে সোনার যে নিশ্চয়তা ছিল, ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সেই সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন ডলারের পতন অনিবার্য। কিন্তু বাস্তবে ঘটে উল্টোটা। ডলারের পেছনে সোনার নিশ্চয়তা না থাকলেও, এটি টিকে যায় তেলের রাজনীতির কারণে। ১৯৭৩ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে গোপন কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তোলে পেট্রোডলার ব্যবস্থা, যেখানে তেল কেনাবেচা বাধ্যতামূলকভাবে ডলারে নির্ধারিত হয়। বিনিময়ে সৌদি রাজতন্ত্রের নিরাপত্তা, অস্ত্র ও অবকাঠামোগত সুরক্ষার দায়িত্ব নেয় ওয়াশিংটন। ফলে বিশ্বে যে দেশই তেল কিনুক, তাকে আগে ডলার সংগ্রহ করতে হয় আর ডলার ছাপার ক্ষমতা একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই।
তবে মার্কিন মোড়লগিরি কেবল অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সামরিক শক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ঝওচজও) ও পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সামরিক বাজেট ৮৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা কয়েকটি শক্তিধর দেশের সম্মিলিত সামরিক ব্যয়ের কাছাকাছি। বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ৮০০-এর বেশি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এই বিশাল সামরিক অবকাঠামো কেবল প্রতিরক্ষার জন্য নয়; বরং বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের কার্যকর হাতিয়ার। স্নাযুদ্ধের সময় কোরিয়া ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ন্যাটো সম্প্রসারণ, দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক জোট; সবই এই আধিপত্য বিস্তারের ধারাবাহিকতা।
একই সঙ্গে মার্কিন আগ্রাসন সব সময় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সিআইএ পরিচালিত গোপন অভিযানের মাধ্যমে ১৯৫৩ সালে ইরানে মোসাদ্দেক, ১৯৭৩ সালে চিলিতে সালভাদর আলেন্ডে উৎখাত তার স্পষ্ট উদাহরণ। ২০০৩ সালে ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা অজুহাতে আগ্রাসনের মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল মজুতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও ওপেকভুক্ত একটি রাষ্ট্রকে পেট্রোডলার শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনা। একইভাবে লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফি যখন আফ্রিকার জন্য স্বর্ণভিত্তিক মুদ্রা ও ডলারের বিকল্প তেলব্যবস্থার ধারণা সামনে আনেন, তখনই ন্যাটো হস্তক্ষেপে তার পতন ঘটে। এই আগ্রাসনের আরেকটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী রূপ হলো মার্কিন সফট পাওয়ার অর্থাৎ হলিউড, বৈশ্বিক গণমাধ্যম, এনজিও নেটওয়ার্ক, তথাকথিত গণতন্ত্র প্রচার, রঙিন বিপ্লব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক তথ্যযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে চিন্তা ও মূল্যবোধ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা।
তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোডলার ব্যবস্থা ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। চীন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ধীরে ধীরে ডলারের বাইরে বাণিজ্যিক বিকল্প গড়ে তুলছে। রাশিয়া-চীন জ্বালানি বাণিজ্যে রুবল ইউয়ান ব্যবহার করছে। রাশিয়া প্রায় ৮০% বিদেশি বাণিজ্য এখন রুবল বা হোম মুদ্রায় করছে এবং রেনমিনবিতে বন্ড ইস্যু করছে, ২০১৮ সাল থেকে চীন শাংহাইতে রেনমিনবি (ইউয়ান) ভিত্তিক তেল ফিউচার বাজার চালু করেছে, ব্রিকস জোট নতুন রিজার্ভ মুদ্রার আলোচনা করছে, আর ইউরোপ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্যের জন্য ইনসটেক্স-এর মতো ব্যবস্থা চালু করেছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার পর প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক রিজার্ভ জব্দ হওয়ার ঘটনা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে ডলারের নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তাছাড়া, সৌদি আরবও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৫০ বছরের চুক্তি মেয়াদ শেষ করে চীনের সঙ্গে ইউয়ানে তেল বাণিজ্যের ইঙ্গিত দিয়েছে, যা পেট্রোডলার ব্যবস্থার জন্য সরাসরি হুমকি।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাব ধরে রাখতে বহুস্তরীয় কৌশল নিচ্ছে। প্রথমত, সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে উপস্থিতি জোরদার তথা পারস্য উপসাগরে ঘাঁটি স্থাপন তার উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা। গ্রিনল্যান্ড এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি অবস্থিত এই দ্বীপটি মার্কিন ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে যাওয়ায় গ্রিনল্যান্ডের নিচে থাকা তেল, গ্যাস ও দুর্লভ খনিজ আহরণের সম্ভাবনাও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বাড়িয়েছে। তৃতীয়ত, নিষেধাজ্ঞাকে অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার তথা ইরান, রাশিয়া ও ভেনিজুয়েলা তার স্পষ্ট উদাহরণ। চতুর্থত, প্রযুক্তিগত ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে সুইফট ব্যবস্থা এবং আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের ঋণ নির্ভরতা বজায় রাখা।
বর্তমানে বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশ কোনো না কোনোভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায়, যার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবনে। লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলা এই তেল রাজনীতির সবচেয়ে নির্মম শিকার। বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রমাণিত তেল মজুত, প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বৈশ্বিক মোট মজুতের প্রায় ১৮ শতাংশ থাকা সত্ত্বেও দেশটি আজ চরম অর্থনৈতিক সংকটে। কারণ তারা মার্কিন নিয়ন্ত্রিত তেল ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে স্বাধীন নীতি গ্রহণের চেষ্টা করেছে। এর ফল হিসেবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সরকার উৎখাতের চেষ্টা, বিরোধী শক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা এবং নিকোলাস মাদুরোকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক মার্কিন অভিযান ও ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা প্রভৃতি এক সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ। তাছাড়া, ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে উৎকৃষ্টমানের ডিজেল, অ্যাসফল্ট ও শিল্প জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব, যা যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও অবকাঠামোগত চাহিদার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত হওয়ায় পরিবহন ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম, যা যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তোলে।
সব মিলিয়ে তেল, ডলার ও আগ্রাসনের রাজনীতি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো শক্তিশালী, কিন্তু তার আধিপত্য আর প্রশ্নাতীত নয়। ডি-ডলারাইজেশন হয়ত আজই পেট্রোডলার ব্যবস্থা ভেঙে ফেলবে না, তবে এটি সেই প্রক্রিয়ার সূচনা, যা এক সময় বিশ্ব ব্যবস্থাকে বহুমাত্রিক শক্তির ভারসাম্যের দিকে নিয়ে যাবে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো কি একমুখী বৈশ্বিক নির্ভরতার ফাঁদে আটকে থাকবে, নাকি বহুমুখী কূটনীতি ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পথে হাঁটবে? ইতিহাসের রায় এখনো বাকি, তবে লক্ষণ স্পষ্ট- পুরোনো মোড়লত্ব আর আগের মতো নির্বিঘ্ন নেই।
শিক্ষার্থী, স্ন্নাতকোত্তর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
