আনোয়ার হোসাইন সোহেল : পণ্য আমদানির আড়ালে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ‘আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এছাড়াও কোম্পানিটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ ঘোষণার পরও বিতরণ না করার অভিযোগ রয়েছে।
মামলায় অভিযুক্তরা হলেনÑপ্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আজিমুল ইসলাম, পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম এবং দুই স্বতন্ত্র পরিচালক তানিম নোমান সাত্তার ও মো. আজহারুল ইসলাম। গতকাল বৃহস্পতিবার বিষয়টি জানিয়েছেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান।
তিনি জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধান ও সংগৃহীত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও এমডিসহ সংশ্লিষ্ট পরিচালক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গত ৭ জানুয়ারি ডিএমপির গুলশান থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলাটি করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে বিশেষ পুলিশ সুপার জানান, অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে গুলশানে এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ পিএলসির (এক্সিম ব্যাংক) হেড অফিস থেকে ৬টি এলসি বা সেলস্ কন্ট্রাক্ট দিয়ে ৫৬টি ইএক্সপি গ্রহণ করে। বিপরীতে রেডিমেড গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি করে নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও এখন পর্যন্ত রপ্তানিমূল্য প্রত্যাবাসন করেনি বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে সত্যতা পাওয়া গেছে।
সিআইডি সূত্রে জানা যায়, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড বৈধ আমদানির ঘোষণা দিলেও প্রকৃতপক্ষে ঘোষণাকৃত পণ্যের তুলনায় কম অথবা ভিন্ন পণ্য আমদানি করে প্রায় ২৮ কোটি ৪০ লাখ ৮৮ হাজার ৮১৪ টাকা বিদেশে পাচার করেছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে বিদেশে স্থানান্তর করা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, ঘটনার অনুসন্ধানে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নিবন্ধিত কার্যালয় ও কারখানার নথিপত্র, আমদানি সংক্রান্ত কাগজপত্র, এলসি ডকুমেন্ট, ব্যাংক হিসাব বিবরণী এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে অনিয়মের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য ও পরিমাণে কারচুপি বা গড়মিল দেখিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার অপব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তথ্য উদঘাটন, এর সঙ্গে জড়িত অজ্ঞাত অন্যান্য সদস্যদের শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের স্বার্থে সিআইডির তদন্ত ও অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান।
গত ১৫ ডিসেম্বর আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে লভ্যাংশ ঘোষণার পরও বিতরণ না করার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন মো. মহিউদ্দিন ভূঁইয়া নামে একজন বিনিয়োগকারী।
অভিযোগের বিষয়ে ওই বিনিয়োগকারী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি ২০২৪ সালের জন্য যে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল, তা এখনো তার ব্যাংকের হিসাবে পাঠানো হয়নি। এ নিয়ে একাধিকবার কোম্পানিটির কার্যালয়ে সরাসরি যোগাযোগ করলেও কোনো কার্যকর সমাধান পাইনি।’
ওই বিনিয়োগকারীর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) শেষে যথাসময়ে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ পরিশোধ করছে না। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব থাকায় কোম্পানিগুলো ঘোষিত লভ্যাংশ দীর্ঘদিন আটকে রাখার সুযোগ পাচ্ছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, ঘোষিত লভ্যাংশ সময়মতো বিতরণ না হলে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা অভিযোগ পেয়েছি, বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মাহফুজুর রহমানকে ফোন করলে তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।
সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা গেছে, আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং এক বছর আগের ঘোষিত শেয়ারপ্রতি এক পয়সা করে মোট এক কোটি ৮০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা লভ্যাংশ পরিশোধ করেনি। অথচ একই মালিকের আরেকটি প্রতিষ্ঠান আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ১০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ পরিশোধ করছে। এতে কোম্পানিটির শেয়ারমূল্যও বাড়ছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা যায়, দেশের পুঁজিবাজারে আলিফ গ্রুপে পোশাক খাতের দুই সহযোগী প্রতিষ্ঠান আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি এবং আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড তালিকাভুক্ত। এর মধ্যে আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাববছরের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। কোম্পানিটি সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের এক শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। অর্থাৎ মোট লভ্যাংশের পরিমাণ এক কোটি ৮০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। কিন্তু আট মাসেও এ লভ্যাংশ পরিশোধ করতে পারেনি। ফলে নিয়মিতভাবে শেয়ারের দাম কমেছে।
অপরদিকে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। এ লভ্যাংশ কিছুটা দেরিতে হলেও উদ্যোক্তারা পরিশোধও করে। তবে কোম্পানিটি বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের কথা বলা হলেও সেসব ঘোষণার তেমন বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কয়েক বছর আগে ডেনিম প্রস্তুতকারী কোম্পানি রয়েল ডেনিম লিমিটেডের মালিকানা অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। তখন রয়েল ডেনিমের উদ্যোক্তাদের কাছে থেকে শেয়ার ক্রয়, শ্রমিকদের বেতন, বোনাস, বেপজা বকেয়া পাওনা এবং ইসলামী ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের কার্যকর পদক্ষেপ ও অধিগ্রহণের সব প্রক্রিয়া পরিপালনের কথা ছিল। কিন্তু অধিগহণের শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হয় আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ। বিষয়টি নিয়ে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও এমডিকে আইনগত নোটিসও দিয়েছিল রয়েল ডেনিমের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান।
বেশ কয়েকজন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিজকে বলেন, আলিফ গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ বিতরণে দুই রকমের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে, যা আমাদের জন্য হতাশাজনক। আর আলিফ গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কোম্পানি অধিগ্রহণের কথাও বলা হলেও নির্দিষ্ট সময়ে তেমন কোনো কিছু ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে পারেনি, যা ছিল শুধু নিজেদের দাম বাড়ানোর জন্য ঘোষণা। এসব আয়োজন নিজেরাই লাভবান হওয়ার উদ্যোগ, যা কমিশনের তদন্ত করা উচিত।
চলতি বছরের জুলাইয়ে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালকদের কাছে শেয়ার ইস্যু করে ২০০ কোটি টাকা তহবিল সংগ্রহের আবেদনটি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাতিল করে। ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রুগ্ন প্রতিষ্ঠান সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলসকে পুনরুজ্জীবিত করার আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের পরিকল্পনা আবারও ধাক্কা খায়।
