নিজস্ব প্রতিবেদক : ইমাম, মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের সরকারি সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল শনিবার বেলা সোয়া ১১টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে বগুড়ার বায়তুল রহমান সেন্ট্রাল মসজিদের ইমাম হোসাইন আহমেদ আবদুল্লাহর হাতে সম্মানীর চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
পরে আইবাস সিস্টেমে ‘সেন্ট বাটন’ প্রেস করে সম্মানীর টাকা পূর্বনির্ধারিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশের হাজারো মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জার উপাসকেরা প্রথমবারের মতো সরাসরি রাষ্ট্রীয় ভাতার আওতায় এলেন।
সরকারের এই উদ্যোগের আওতায় দেশজুড়ে ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের পাশাপাশি ৯৯০টি মন্দিরের পুরোহিত ও সেবাইত, ১৪৪টি বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ এবং ৩৯৬টি গির্জার যাজক ও পালকসহ উপাসনালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সম্মানী পাবেন।
পাইলট প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি মসজিদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ অর্থ থেকে ইমাম পাঁচ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন তিন হাজার টাকা ও খাদেম দুই হাজার টাকা করে পাবেন।
এ ছাড়া মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জার জন্য মাসিক আট হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি (পুরোহিত/অধ্যক্ষ/যাজক) পাবেন পাঁচ হাজার টাকা ও সহকারী দায়িত্বশীল ব্যক্তি (সেবাইত/উপাধ্যক্ষ/সহকারী পালক) পাবেন তিন হাজার টাকা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ অনুষ্ঠানে সম্মানীর পাশাপাশি উৎসব বোনাস দেওয়ার কথাও জানান। তিনি জানান, মসজিদে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় এক হাজার টাকা করে বোনাস দেওয়া হবে।
দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা বা বড়দিনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় নেতাদের দুই হাজার টাকা করে বোনাস প্রথম পৃষ্ঠার পর
দেওয়া হবে। তবে যেসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে সরকারের কাছ থেকে কিংবা বিদেশি সংস্থা থেকে নিয়মিত অনুদান পায়, সেসব আপাতত এ সুবিধার বাইরে থাকবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন ভোটের কালি মোছার আগেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি। তিনি বলেন, আজকের ব্যতিক্রমধর্মী এই অনুষ্ঠানে আপনারা এমন কিছু মানুষ একত্রিত হয়েছেন, কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই মানুষ যাদের সম্মান করে, জীবনের অনেক কঠিন মুহূর্তে যাদের কাছে দুটো ভালো উপদেশের আশা করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অনুষ্ঠানে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিন রয়েছেন। একইসঙ্গে রয়েছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ধর্মের ধর্মীয় নেতৃত্ব। পুরোহিত, সেবায়েত, বিহার অধ্যক্ষ এবং উপাধ্যক্ষ। যে উদ্দেশ্যে আজ আমরা এখানে একত্র হয়েছি, ইতোমধ্যেই আপনারা সেটি জেনেছেন। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যারা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন, তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থিক বৈষম্য দূর করে আমরা সবাই মিলে ভালো থাকব। জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা জনগণের কাছে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, জনগণের রায়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর ভোটের কালি নখ থেকে মোছনের আগেই আমরা আমাদের সব প্রতিশ্রুতি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি।
তারেক রহমান বলেন, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য আমরা ইতোমধ্যেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করেছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে এই কার্ড সারা দেশে সবাই পাবেন। আগামী ১৪ এপ্রিল তথা পয়লা বৈশাখ থেকে চালু হচ্ছে ‘ফার্মার্স কার্ড’ বা ‘কৃষক কার্ড’। আগামী ১৬ মার্চ দিনাজপুর থেকে শুরু হচ্ছে খাল খনন কর্মসূচি। আজ থেকে চালু হলো খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি।
তিনি বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি শ্রেণি পেশার মানুষ তথা প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার রাষ্ট্রীয় সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবে। তবে নাগরিকদেরও কিন্তু রাষ্ট্র এবং সমাজের প্রতি কিছু দায়-দায়িত্ব রয়েছে। নাগরিক হিসেবে আমরা যদি যে যার অবস্থান থেকে রাষ্ট্র এবং সমাজের প্রতি যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি… আমি আশা করি, দ্রুততম সময়ে আমরা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ দেখতে পারব, ইনশাআল্লাহ।
তারেক রহমান বলেন, দুনিয়ার কল্যাণের পাশাপাশি আখেরাতের কল্যাণের জন্য প্রার্থনার কথা পবিত্র কোরআনুল কারিমে রয়েছে। ইহকালীন-পরকালীন কল্যাণবিষয়ক নির্দেশনা নিঃসন্দেহে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিধিবিধান অনুযায়ীও নির্দেশিত রয়েছে। সুতরাং, ধর্মীয় বিধিবিধানের আলোকেই আপনারা আপনাদের শিক্ষা, দীক্ষা ও যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে কীভাবে আরও বেশি করে দেশ এবং জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারেন, সেই চিন্তা এবং চেষ্টা অব্যাহত রাখাও জরুরি।
অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র মানুষের জীবনে হয়তো আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করে; কিন্তু ধৈর্য, সততা, কৃতজ্ঞতাবোধ, শ্রদ্ধা, আনুগত্য, সংহতি, সহনশীলতা, উদারতা, বন্ধুত্ব, বিনয়, দায় কিংবা দয়াÑএসব বৈশিষ্ট্য অর্জন ছাড়া একজন ব্যক্তি মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে না। এ ধরনের মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জনের জন্য ধর্মীয় সামাজিক নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি। রাষ্ট্র-সমাজ এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকে অর্জিত আচরণ থেকেই মানুষ তার শুদ্ধ জীবন এবং সুস্থ চিন্তার মানসিক নির্দেশনা পায়।
তিনি বলেন, দেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মসজিদ রয়েছে। আমরা সারা দেশের এই মসজিদগুলোকে ধর্মীয় সামাজিক এবং নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে পারি। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার সরকারের সময় দেশে প্রথমবারের মতো ‘ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি’ চালু করেছিলেন।
তিনি বলেন, খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিনদের সম্মানী ভাতা দেওয়ার যে কর্মসূচি আপনাদের সরকার চালু করেছে, এই কর্মসূচির অধীনে প্রথম পর্যায়ে পাইলটিং স্কিমের আওতায় মোট ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদ, ৯৯০টি মন্দির এবং ১৪৪টি বৌদ্ধ বিহারের মোট ১৬ হাজার ৯৯২ জন মাসিক সম্মানী পাচ্ছেন। সবাইকেই পর্যায়ক্রমে এই কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সরকারের এইসব অর্থনৈতিক কর্মসূচি উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নাগরিকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা।
ইমাম-মুয়াজ্জিনদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা কেউ মসজিদে কিংবা যার যার ধর্মীয় উপাসনালয়ে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজেদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক-সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে চাইলে আপনাদের সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নেও সরকার সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
প্রতিটি জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মিটিংয়ে একজন ইমাম-খতিব বা ধর্মীয় প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে গত ১০ মার্চ দেশের ৩৭ হাজার পরিবারের প্রধান নারীর হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘ফ্যামিলি কার্ড’। পর্যায়ক্রমে সারা দেশের চার কোটি পরিবারের কাছে এই কার্ড পৌঁছে দেবে সরকার। এর সঙ্গে আগামী মাস থেকে কৃষকদের মধ্যে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ শুরু হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
