মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলার ঘটনা অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে দেশটির ভেতরে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছয়টি ড্রোন আঘাত হেনেছে।
এই হামলার ঘটনায় নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী দ্রুত প্রতিরোধ ব্যবস্থা চালু করে অনেক হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের হামলায় একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ছয়টি ড্রোন আরব আমিরাতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আঘাত হানে।
তবে একই সময়ে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে বিপুল সংখ্যক ড্রোন প্রতিহত করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৩১টি ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে।
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে সাম্প্রতিক সময়ে ড্রোন যুদ্ধ এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। আধুনিক যুদ্ধের নতুন রূপ হিসেবে ড্রোন হামলা এখন বড় শক্তিগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাতেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত শনিবার থেকে দেশটির দিকে একাধিক হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত মোট ১৯৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে।
শুধু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই নয়, পাশাপাশি আটটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় সংখ্যায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার দেখায় যে এই সংঘাত পরিকল্পিত এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কৌশলের অংশ হতে পারে।
আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনী বলছে, তাদের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সাহায্য করেছে।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার জন্য দেশটি আধুনিক রাডার এবং মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম ব্যবহার করছে। এই প্রযুক্তির কারণে অনেক হামলা লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করেছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের সবাই বিদেশি নাগরিক।
নিহতদের মধ্যে একজন পাকিস্তানের নাগরিক, একজন নেপালের নাগরিক এবং একজন বাংলাদেশের নাগরিক রয়েছেন।
এছাড়া হামলার পর থেকে মোট ৯৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আরব আমিরাত সরকার। আহতদের অনেকেই বিভিন্ন দেশের প্রবাসী শ্রমিক।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক কাজ করেন। তাই এ ধরনের হামলায় অনেক সময় বিদেশি নাগরিকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু মানুষ জীবিকার জন্য আরব আমিরাতে কাজ করেন। নির্মাণ, সেবা ও শিল্পখাতে এসব শ্রমিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাই কোনো সংঘাত বা হামলার ঘটনা ঘটলে প্রবাসী পরিবারগুলো স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়।
সাম্প্রতিক এই হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনারই একটি অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই অঞ্চলে বহুদিন ধরেই বিভিন্ন শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। কখনো সরাসরি যুদ্ধ, আবার কখনো প্রক্সি সংঘাতের মাধ্যমে এই উত্তেজনা প্রকাশ পায়।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে এখন অনেক সংঘাত আরও দ্রুত এবং অপ্রত্যাশিতভাবে বিস্তার লাভ করছে।
বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহার দ্রুত বেড়ে গেছে।
ড্রোন তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা যায় এবং দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ফলে সামরিক অভিযান চালাতে এগুলো অনেক সময় কার্যকর হয়ে ওঠে।
এই কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের অনেক সংঘাতে এখন ড্রোন হামলা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরব আমিরাতে সাম্প্রতিক এই হামলার পর ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদি এই ধরনের হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা জরুরি হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দিকেও জোর দিচ্ছে।
