Print Date & Time : 14 January 2026 Wednesday 8:03 am

ইসলামী ব্যাংকিং একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা : গভর্নর

নিজস্ব প্রতিবেদক : ইসলামী ব্যাংকিং কেবল ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। গতকাল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত আন্তর্জাতিক ইসলামি ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং কনফারেন্সের সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং কেবল ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকিংয়ের এক চতুর্থাংশের বেশি শেয়ার ইসলামী ব্যাংকগুলোর। শরিয়াহ ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিংয়ে  দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়। আর বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং মানুষের সচেতন পছন্দের ফল। ভবিষ্যতে এ খাত আরও বিস্তৃত হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি বড় অংশ শরিয়াহভিত্তিক হলেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য বিনিয়োগের সুযোগ এখনো সীমিত। এ কারণে এসব ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য শরিয়াহভিত্তিক বন্ড বা সুকুক বাজার গড়ে তোলার প্রয়োজন।

গভর্নর জানান, বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংকিং সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থার অধীনে রয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হয়নি। ফলে তারল্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে এবং প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রও সীমিত হয়ে পড়েছে। শরিয়াহভিত্তিক মানি মার্কেট ও সুকুক বাজার না থাকায় ব্যাংকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সরকারের উদ্যোগে সুকুক বাজার গড়ে তোলা হলে একদিকে সরকারের অর্থায়ন ব্যয় কমবে, অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকগুলো তারল্য ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি পাবে। এতে পুরো খাতটি আরও স্থিতিশীল হবে।

সম্মেলনে গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং কেবল ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এখানে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং মানুষের সচেতন পছন্দের ফল। ভবিষ্যতে এ খাত আরও বিস্তৃত হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি জানান, বর্তমানে দেশের মোট আর্থিক সম্পদের একটি বড় অংশ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অধীনে থাকায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বও বেড়েছে। এ সম্পদ যেন সঠিকভাবে ব্যবহƒত হয় এবং আমানতকারীরা ভালো রিটার্ন পান, সেটি নিশ্চিত করাই এখন নিয়ন্ত্রকদের প্রধান দায়িত্ব।

গভর্নর বলেন, নীতিগতভাবে ইসলামী ব্যাংকিং সবচেয়ে নিরাপদ ঋণব্যবস্থা হওয়ার কথা। কারণ এটি সম্পদ ও আয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে এ নীতির সঠিক প্রয়োগ হয়নি। কিছু গোষ্ঠীর দখলদারির কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম হয়েছে। এতে গ্রাহক ও আমানতকারীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

তিনি আরও বলেন, এ অনিয়মের দায় শুধু একটি পক্ষের নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, শরিয়াহ বোর্ড এবং আমানতকারীরা সবাই যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমানতকারীরাও তাদের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেননি।

ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরাতে সম্প্রতি পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে উল্লেখ করেন গভর্নর। বলেন, একই সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে দেশে অন্তত দুটি বড় ও শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংক গড়ে উঠবে, যারা সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমানতকারীদের ভালো রিটার্ন দেবে।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ইসলামী ব্যাংকগুলো সাধারণ ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আমানতকারীদের ভালো মুনাফা দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ খাত থেকে বিপুল অর্থ লুটপাটের সুযোগ নিয়েছে।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক খাত জনগণের আস্থা হারায়নি। গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি আমানত এসেছে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া সহায়তার অর্থ ফেরত দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ।

ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়েছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, এ লক্ষ্যে একটি নতুন ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের কাজ চলছে।

শরিয়াহ বোর্ডের ভূমিকা প্রসঙ্গে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘শরিয়াহ বোর্ডকে শক্তিশালী ও সাহসী ভূমিকা রাখতে হবে। বোর্ডের সদস্যদের চাকরির ভয় করলে চলবে না।’

দুদিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করে সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগ। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের অতিথিরা অংশ নেন।