Print Date & Time : 24 May 2026 Sunday 2:32 am

ঈদযাত্রায় রেলের বড় ভরসা ৪০ বছরের পুরোনো ইঞ্জিন!

চট্টগ্রাম ব্যুরো: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে দুই ঈদেই দেশের পরিবহন খাতের আসল কঙ্কালসার রূপটি উšে§াচিত হয়। প্রতিবারের মতো এবারও আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বাংলাদেশ রেলওয়ে ‘নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ’ যাত্রীসেবা নিশ্চিতের গালভরা আশ্বাস দিচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে শুরু করে রেল প্রশাসন প্রতিবছরই দাবি করেÑ‘এবার ঈদযাত্রা হবে স্বস্তির’। তবে ট্রেনের টিকিট কাটার যুদ্ধ থেকে শুরু করে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বরাবরের মতোই তিক্ত। এবারের ঈদযাত্রায় রেলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ও উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে জরাজীর্ণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনগুলো। তীব্র ইঞ্জিন সংকটের কারণে শুধু ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ই নয়, যেকোনো সময় মাঝপথে ট্রেন বিকল হয়ে পুরো রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন খোদ রেলের কর্মকর্তারাই। ফলে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি থাকলেও বাস্তবে লাখ লাখ ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে যাচ্ছে। রেলওয়ে সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে বর্তমানে মোট ২৯৭টি ইঞ্জিন রয়েছে। এর মধ্যে ১৫০টি ইঞ্জিনেরই অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল (ইকোনমিক লাইফ) শেষ হয়ে গেছে; যা মোট ইঞ্জিনের ৫১ শতাংশ। সাধারণত রেল ট্র্যাকে যুক্ত হওয়ার পর একটি ইঞ্জিনের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বা অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ বছর। সেই হিসাবে অর্ধেকেরও বেশি ইঞ্জিন এখন চরম ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

রেলের হিসাব অনুযায়ী, ৪০ বছরের বেশি পুরোনো ইঞ্জিনই রয়েছে ৮৪টি। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে মিটারগেজ ইঞ্জিন ১৬৭টি ও ব্রডগেজ ইঞ্জিন ১৩০টি। অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল রয়েছে রেলওয়েতে এমন ইঞ্জিনের সংখ্যা ১৪৭টি। বাকি ১৫০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৫০টি ও ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী রয়েছে ১৬টি। অবশিষ্ট ৮৪টি ইঞ্জিনের বয়স ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে। বর্তমানে রেলওয়েতে মিটারগেজ ইঞ্জিন রয়েছে ১৬৭টি এবং ব্রডগেজ ইঞ্জিন ১৩০টি। স্বাভাবিক সময়েই যেখানে ইঞ্জিনের অভাবে অনেক রুটে ট্রেন চালানো দায় হয়ে পড়ে, সেখানে ঈদের মতো মহাব্যস্ত সময়ে এই লক্কড়-ঝক্কড় ইঞ্জিনগুলো দিয়ে কীভাবে চাপ সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ঈদযাত্রার বিপুল যাত্রীচাপ সামাল দিতে প্রতিদিন পূর্বাঞ্চলেই প্রয়োজন অন্তত ৯০ থেকে ৯৫টি লোকোমোটিভ। অথচ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ১০০টি ইঞ্জিনের চাহিদা থাকলেও দৈনিক হাতে পাওয়া যায় মাত্র ৭৮ থেকে ৮০টি। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে এবং ঈদযাত্রা সচল রাখতে রেলওয়ের পাহাড়তলী ও ঢাকা বিভাগের লোকোমোটিভ কারখানায় ৯০টি ইঞ্জিন তড়িঘড়ি করে মেরামত করা হয়েছে।

কারখানা সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়তলী ডিজেল শপে ৫৫টি এবং ঢাকা বিভাগে ৩৫টি ইঞ্জিন প্রস্তুতের কাজ করা হয়েছে। ৪৬টির জোড়াতালি দেওয়া মেরামত কাজ শেষ হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মতে, জরুরি মেরামত মূলত ‘তাৎক্ষণিক উপশম’ মাত্র। দীর্ঘদিনের পুরোনো এবং ক্ষয়ে যাওয়া পার্টস জোড়াতালি দিয়ে সচল করা এই ইঞ্জিনগুলো অতিরিক্ত ট্রেনের লোড নিয়ে কতটা পথ নির্বিঘ্নে পাড়ি দিতে পারবে, তা নিয়ে খোদ কারখানার কর্মীরাই সন্দিহান।

রেলওয়ের এই ভগ্নদশার পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে চলা জনবল সংকট এবং নিম্নমানের যন্ত্রাংশ কেনাকাটার সংস্কৃতি। কারিগরি দক্ষতার অভাবে ইঞ্জিনগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পাহাড়তলী বিভাগীয় চিফ পাওয়ার কন্ট্রোলার প্রকৌশলী রাজেন্দ  প্রসাদ ভৌমিক জানান, দক্ষ লোকবলের সংকট এবং মানসম্মত যন্ত্রাংশের অভাবে ইঞ্জিন মেরামতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারখানায় অভিজ্ঞ কর্মী বা টেকনিশিয়ানের সংখ্যা দিন দিন কমছে। ফলে বাধ্য হয়ে একদম নতুন ও অনভিজ্ঞদের দিয়েই অনেক গুরুত্বপূর্ণ যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতের কাজ চালাতে হচ্ছে। এতে স্পষ্ট, যে ইঞ্জিনের ওপর ভর করে লাখো মানুষ ঈদের রাতে বাড়ি ফিরবেন, সেটির মেরামত কাজ হচ্ছে দক্ষ জনবল ছাড়াই। ফলে মাঝপথে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।

ঈদের বিশেষ চাপ সামলানোর জন্য রেলের একমাত্র কৌশল হলো পণ্যবাহী বা মালবাহী ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ পাওয়ার কন্ট্রোলার প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান জানান, ঈদের সময় মালবাহী ট্রেন বন্ধ থাকায় সেখান থেকে কিছু অতিরিক্ত ইঞ্জিন অবমুক্ত করে যাত্রীবাহী ট্রেনে ব্যবহার করা হয়। দুই বিভাগ থেকে ঈদে বাড়তি ট্রেনের চাহিদা পাওয়ার পর সেই অনুযায়ী ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া হয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো স্থায়ী বা পেশাদার সমাধান নয়। মালবাহী ট্রেন বন্ধ রাখায় দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও বন্দরে পণ্য পরিবহনে স্থবিরতা তৈরি হয়, যা অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনে। তাছাড়া মালবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনগুলোর ক্ষমতা ও গতিবেগ অনেক সময় আন্তঃনগর ট্রেনের উপযোগী হয় না। ফলে ট্রেনের গতি কমে গিয়ে শিডিউল বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়।

গত কয়েক বছরের রেল চলাচলের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট কিংবা উত্তরবঙ্গগামী রুটে মাঝপথেই ইঞ্জিন বিকল হয়ে ট্রেন আটকে থাকার ঘটনা নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রুটে বা দূরপাল্লার আন্তঃনগর ট্রেনগুলো পুরোনো ইঞ্জিনের কারণে মাঝপথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। একটি ট্রেন মাঝপথে বিকল হলে পেছনের সমস্ত ট্রেনের সময়সূচি ওলটপালট হয়ে যায়। ঈদের সময় যেখানে প্রতি মিনিটে ট্রেনের শিডিউল ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে একটি মাত্র ইঞ্জিন বিকল হলে পুরো দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় চেইন রিয়্যাকশন বা ধস নামতে পারে। কমলাপুর বা চট্টগ্রাম স্টেশনে চাতক পাখির মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেনের জন্য অপেক্ষার যে চেনা দৃশ্য, এবারও তার পুনরাবৃত্তি ঘটার সব রকম উপাদান মজুত রয়েছে।

প্রতিবছর রেলের বাজেট বাড়ে, হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প পাস হয়, কিন্তু সাধারণ যাত্রীদের নিরাপদে ও যথাসময়ে বাড়ি ফেরার ন্যূনতম গ্যারান্টি মেলে না। জোড়াতালির ইঞ্জিন, দক্ষ জনবলের অভাব এবং ফিটনেসবিহীন বগি নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে এবার যে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঈদযাত্রার আয়োজন করেছে, তার খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত কেবল আশ্বাসের বাণী না শুনিয়ে, রেলের এই কাঠামোগত ও যান্ত্রিক সংকট দূরীকরণে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া। অন্যথায়, প্রতি ঈদের মতোই এবারও সাধারণ মানুষের আনন্দযাত্রা পরিণত হবে চরম ভোগান্তির নামান্তরে।