ওয়ালিউর রহমান ফরহাদ: অসংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ (হাইপার টেনশন) একটি দীর্ঘস্থায়ী জীবনব্যাপী রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে ১৪০ কোটি মানুষ (৩০-৭৯ বছর) উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে, যাদের বেশিরভাগ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের।
উচ্চ রক্তচাপের কারণে অনেকে হƒদরোগ, স্ট্রোক এবং কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আর এতে মৃত্যুর সংখ্যা বহুগুণ বাড়ছে।
বিশ্বে প্রতিবছর এক কোটিরও বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপের কারণে মারা যায়। এ সংখ্যা সব সংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর সংখ্যার চেয়েও বেশি। বাংলাদেশেও উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। চলছে উচ্চ রক্তচাপের নীরব মহামারি।
সবশেষ ‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে, ২০২২’-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি চারজনে একজন (২৩ দশমিক ৫ শতাংশ) প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপজনিত অসুস্থতা এবং অকাল মৃত্যুর বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশে কমিয়ে আনার বিষয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (লক্ষ্য ৩.৪ শতাংশ) অর্জন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এমন বাস্তবতায় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও ১৭ মে পালিত হয়েছে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এই দিবসটি পালন করা হয়।
উচ্চ রক্তচাপকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, কারণ এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না, অথচ এটি স্ট্রোক ও হƒদরোগ এবং অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
এই বছরের বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘একসঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করি; নীরব ঘাতককে জয় করি’।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উচ্চ রক্তচাপ-বিষয়ক দ্বিতীয় বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০-৭৯ বছর বয়সি জনগোষ্ঠীর ৩৩ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত এবং ১৯৯০ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬৫ কোটি থেকে বেড়ে ১৪০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।
এ সময়ে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ ধনী দেশগুলো থেকে কমে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে মাত্র ৩২০ মিলিয়ন (২৩ শতাংশ) মানুষ তাদের রক্তচাপ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, শুধু কানাডা, কোস্টারিকা, আইসল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার ৫০ শতাংশের বেশি। ৯৯টি দেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার ২০ শতাংশেরও কম। ২০১১ সালে উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর ১৬ শতাংশ এবং অসংক্রামক রোগের জন্য দায়ী অন্য যে কোনো ঝুঁকির থেকে বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হেলথ এন্ড মরবিডিটি সার্ভে ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের (৩০-৭৯ বছর) অর্ধেকই (৫৩ শতাংশ পুরুষ, ৪৫ শতাংশ নারী) জানে না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে চিকিৎসা গ্রহণের হার মাত্র ৩৯ শতাংশ (৩৫ শতাংশ পুরুষ, ৪২ শতাংশ নারী)। নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে মাত্র ১৬ শতাংশ (১৫ শতাংশ পুরুষ, ১৬ শতাংশ নারী) অর্থাৎ প্রতি সাতজনে একজন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৪০০ মানুষ হƒদরোগজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করেছে, যার ৫২ শতাংশের (৪৮ শতাংশ পুরুষ, ৫৬ শতাংশ নারী) জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে করণীয় সম্বন্ধে জানতে চাইলে পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. সাইয়েদ উমর খৈয়াম শেয়ার বিজকে বলেন, উচ্চ রক্তচাপ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রথমেই আমাদেরকে খাবারে লবণ কম খেতে হবে, শাকসবজি প্রচুর পরিমাণে খেতে হবে, কমপক্ষে আধা ঘণ্টা শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করতে হবে, নিয়মিত সঠিক সময়ে নির্দিষ্ট সময় ঘুমাতে হবে।
এখন অনেকেই মোবাইল ফোনের আসক্তিতে রাত জাগে, প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমায়। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম না হওয়ায় অনেকেই মানসিক উত্তেজনা বা চাপে থাকে। ধূমপানের কারণেও উচ্চ রক্তচাপ হয়, তাই ধূমপান কিংবা তামাক পণ্যের ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে এই কয়েকটি বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, কারও যদি মাথা বা ঘাড় ব্যাথা হয়, মাথা ঘোরায় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং রক্তচাপ পরীক্ষা করা দরকার। উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হলে নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে।
হƒদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গৌরাঙ্গ কুমার সাহা শেয়ার বিজকে বলেন, কারও যখন উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হয়, তখন ওষুধ খেয়ে নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। লাইফ স্টাইল পরিবর্তন করলে কিছুটা কমে কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সারাজীবন ওষুধ খেতে হয়। অর্থাৎ একদিকে প্রতিরোধ, আরেকদিকে চিকিৎসা নিতে হবে। দেশের প্রায় প্রতি চারজনে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। বিপদের কথা এদের অধিকাংশই জানে না, তাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে।
যারা জানে তাদের অর্ধেক ওষুধ খাচ্ছে। দেশে যত উচ্চ রক্তচাপের রোগী আছে, তাদের মাত্র ১৬ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
তিনি আরও বলেন, দেশে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্তের একটা গ্যাপ আছে, আবার যাদের শনাক্ত হচ্ছে, তাদেরও সঠিকভাবে চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের অনেকেরই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। অর্থাৎ আমাদের তিনটি বিষয়ে নজর দিতে হবে, গণহারে উচ্চ রক্তচাপের স্ক্রিনিং কার্যক্রম চালাতে হবে। শনাক্ত রোগীদের সারাজীবন ওষুধ খেতে হয় এবং এটা অনেক ব্যয়বহুল, আবার ওষুধ না খেলে রোগটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে না, তাই সরকারকে যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের বিনা পয়সায় ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
হƒদরোগ বিশেষজ্ঞ এই অধ্যাপক জানান, ওষুধ দেওয়ার পর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে কি না নিয়মিত সেটা ফলোআপ করতে হবে। এই কয়েকটি কাজ করতে পারলে ধীরে ধীরে কন্ট্রোল রেট বাড়বে, যেটা আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ৭০ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়া, সেটা অর্জন করতে পারব। এটা করতে পারলে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকে যে অকাল মৃত্যু হচ্ছে তাও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
