মো. সাইফুল ইসলাম: ব্যবসা বা বিনিয়োগ করার জন্য মানুষ ঋণ নেয় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে। বিনিময়ে ওই প্রতিষ্ঠান ঋণ গ্রহীতা থেকে সুদ আদায় করে। এখন দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিতিশীল অবস্থায় অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে পারছেন না, আবার কেউ কেউ ঋণ রেখে মারা যাচ্ছেন। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মামলা করবে বা বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে (যদি সঠিক সম্পত্তি পাওয়া যায়) টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করবে। আমরা আজ পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে ঋণ ও সুদ পরিশোধের বিষয়গুলো আলোচনা করব।
সম্প্রতি কয়েকজন ব্যবসায়ী বিশাল অংকের ব্যাংক ঋণ রেখে মারা গেছেন। এর মধ্যে একজন জেলখানায় মারা যান। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে অনেক উদ্যোক্তা দেশের বাইরে থেকে বিলাসী জীবনযাপন করছেন, কিন্তু ব্যাংক ঋণ শোধ করছেন না।
ঋণ মানে ধার-দেনা কর্জকে বোঝায়। কয়েকটি অবস্থায় মানুষ ঋণ করে। এক শ্রেণি আছে আক্ষরিক অর্থে অভাব অনটন বা সংকটে পড়ে ঋণ করে। সংকট কেটে গেলে ঋণ পরিশোধ করে অথবা পরিশোধের সৎ উদ্দেশ্য থাকে । আরেক শ্রেণি আছে যারা ঋণ করে স্বভাবজাতভাবে। বিনিয়োগের নামে ঋণ করে বিলাসিতা করে। এরা ঋণ নিয়ে পরিশোধের ব্যাপারে মনে অসৎ অভিপ্রায় পোষণ করে।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কখনও কখনও এমন মুহূর্ত আসে যখন প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে হাতে যথেষ্ট অর্থ থাকে না। এই পরিস্থিতিতেই মানুষ ঋণগ্রস্ত হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক কিংবা জরুরি প্রয়োজনে— ঋণ এমন একটি আর্থিক সহায়তা যা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেয়। সঠিকভাবে পরিকল্পনা করে ব্যবহার করলে ঋণ হতে পারে জীবন উন্নয়নের সোপান। আর অযথা ও অপরিকল্পিতভাবে গ্রহণ করলে এটি হয়ে উঠতে পারে বড় আর্থিক চাপের কারণ। যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক জীবন বিষাদময় হয়ে ওঠে।
”
ঋণ গ্রহণ করলে তা পরিশোধ না করা কঠিন গুনাহের কাজ। মহান রাব্বুল আল আমিন পবিত্র কোরআনে ঋণ সম্পর্কে অনেক জায়গায় বর্ণনা করেছেন। রাসুল (সা.) ঋণের ভয়াবহতা, কুফল সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে ‘ঋণের বোঝা নিয়ে মৃত্যুবরণ করলে কেয়ামতের দিন নেকি থেকে পরিশোধ করতে হবে। (বুখারি ও মেশকাত)
নবীজি (সা.) মৃত ব্যক্তির কোনো ঋণ আছে কিনা জানাজা পড়ানোর আগে খোঁজখবর নিতেন। যদি মৃত ব্যক্তি দেনাগ্রস্ত হতো তিনি জানাজায় অংশ নিতেন না। কোরআনে ঋণ গ্রহণকে বৈধ করা হলেও অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন, অবশ্যই লিখে রাখা এবং দ্রুত পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লেনদেনের ক্ষেত্রে দলিল, সাক্ষী ও সময়সীমা নির্ধারণের কঠোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, মৃত্যুর পর ওয়ারিসদের প্রথম দায়িত্ব হলো—মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে তার ঋণ পরিশোধ করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এসব (ওয়ারিসদের প্রাপ্য) অসিয়ত পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পরই দেওয়া হবে।’ (সুরা নিসা : ১১)। ঋণ থেকে পরিত্রাণের জন্য যাকাত গ্রহণ করতে পারবেন বলা হয়েছে। সুরা তওবার ৬০ নাম্বার আয়াত-এ (৬- এ)।
পবিত্র কোরআনে ঋণ : হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যখন একে অন্যের সঙ্গে ঋণসংক্রান্ত লেনদেন করো তখন তা লিখে রেখ। আর তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন তা সঠিকভাবে লিখে দেয়। যেহেতু আল্লাহ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন, তাই লেখক কখনোই লিখতে অস্বীকার করবে না। আল্লাহ-সচেতন থেকে ঋণগ্রহীতা লেখার বিষয় বলে দেবে। কোনো বিষয় যেন বাদ না যায়। কিন্তু ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ বা দুর্বল হয় বা লেখার বিষয়বস্তু বলতে অক্ষম হয়, তবে যেন তার অভিভাবক ন্যায্যভাবে লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়। আর উভয়পক্ষের পছন্দমতো দুজন পুরুষ সাক্ষী থাকবে। দুজন পুরুষ যদি না থাকে তবে একজন পুরুষ ও দুজন নারী। কারণ নারীদের মধ্যে একজন যদি ভুল করে তবে অন্যজন যেন তা মনে করিয়ে দিতে পারে। সাক্ষীদের যখনই ডাকা হোক, তারা সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করবে না। ছোট হোক বা বড় হোক, ঋণ ফেরত দেওয়ার সময়সহ লেনদেনের প্রতিটি খুঁটিনাটি শর্ত লিখে রাখতে কখনো বিরক্ত হবে না। যত বিস্তারিত লিখবে তত আল্লাহর কাছে এটি বেশি ন্যায্য, সাক্ষ্য হিসেবে বেশি নির্ভরযোগ্য, পরবর্তী সময়ে সংশয় ও মতবিরোধ রোধে বেশি কার্যকর হবে। তবে তোমাদের ব্যবসায় নগদ ও মালামাল আদান- প্রদানে লিখিত দলিল না রাখলেও কোনো দোষ নেই অবশ্য যে-কোনো লেনদেন ও বেচাকেনায় সাক্ষী রেখ। লেখক ও সাক্ষী যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখ। যদি এদের ক্ষতিগ্রস্ত করো তবে তা হবে অন্যায়। কারণ আল্লাহই তোমাদের কল্যাণের সঠিক কর্মনীতি শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি সব বিষয়ে সর্বোচ্চ জ্ঞানের অধিকারী। (সুরা বাকারা, আয়াত ২৮২)। হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ-সচেতন থেকো। সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি সত্যি সত্যি তোমরা বিশ্বাসী হয়ে থাক। যদি তোমরা সুদ না ছাড় তবে আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা করো এবং সুদ পরিত্যাগ করো তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই প্রাপ্য হবে। তোমরা জুলুম কর না এবং তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না। যদি খাতক অভাবী হয়, তবে সচ্ছল না হওয়া পর্যন্ত তাকে ছাড় দাও। আর যদি ঋণ মাফ করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্যে আরও কল্যাণের, যদি তোমরা তা জানতে! (সুরা বাকারা, আয়াত ২৭৮-২৮০)।
ঋণশোধের ব্যাপারে নবীজি (সা.) যে কারণে তাগাদা দিতেন : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ঋণী হয় সে যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে।
একবার নবীজি (সা.) মসজিদে নববীতে সাহাবি আবু উমামা অসময়ে বসে থাকতে দেখে তার কাছে গেলেন । বললেন, উমামা এখন তো নামাজের সময় নয়, বসে আছ কেন? তখন সে বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! ঋণের চিন্তায় আমি পেরেশান। তখন তিনি সকাল-সন্ধ্যা পাঠ করার জন্যে তাকে একটা দোয়া শিখিয়ে দিলেন। (সে দোয়াটি হচ্ছে—হে আল্লাহ! দুশ্চিন্তা ও দুর্দশাগ্রস্ত হওয়া থেকে, অক্ষমতা ও আলস্য থেকে আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি। হে আল্লাহ! ভীরুতা ও কৃপণতা থেকে, ঋণে জর্জরিত পরাভূত হওয়া থেকে আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি)। আবু উমামা পরবর্তীতে বলেন, এই দোয়া পাঠের বরকতে আল্লাহ আমাকে দুশ্চিন্তা এবং ঋণ থেকে মুক্তি দিন ।
একজন মানুষ যখন ঋণ করে তার চিন্তার বড় অংশজুড়ে থাকে কীভাবে এই ঋণ শোধ করবে। তার এই চিন্তা থেকে সে কিন্তু বের হতে পারে না। পাওনাদারের সামনে সে সবসময় সংকুচিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি কখনো সম্মানের অধিকারী হয় না। তার আত্মসম্মান বোধটাই শেষ হয়ে যায়।
ঋণশোধ করার ব্যাপারে নবীজি (সা.) তাগাদা দিতেন
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, একজন বিশ্বাসীর আত্মা ওই ঋণ শোধ না করা পর্যন্ত প্রশান্তি পায় না। সে ঝুলে থাকে । জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে না। সাহাবিরা এবং পরবর্তীকালে তাবে তাবেঈন এবং সব বুজুর্গরা প্রত্যেকেই ঋণমুক্ত হয়ে মারা যাওয়ার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।
ঋণগ্রস্ত হওয়াটাকে নবীজি (সা.) কত অপছন্দ করতেন সেটা বোঝা যায় তার জানাজা পড়ানোর ঘটনা থেকে। তিনি যখনই কারো জানাজা পড়াতেন আগে খোঁজ নিতেন যে, মৃতের কোনো ঋণ আছে কিনা। যদি মৃত ব্যক্তি দেনাগ্রস্ত হতো তিনি জানাজায় অংশ নিতেন না । একবার জানাজা পড়াতে গিয়ে তিনি শুনলেন মৃত ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত এবং তিনি কোনো সম্পদ রেখে যায়নি যেখান থেকে ঋণ শোধ করা যাবে। তিনি সাহাবিদের বললেন, তোমরা জানাজা পড়াও। কতটুকু ঋণ খোঁজ নেওয়া হলো। ঋণ খুবই অল্প দুই বা তিন দিনার। উপস্থিত আরেক সাহাবা আবু কাতাদা আরজ করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি এই ঋণের জিম্মাদার হলাম। তখন নবীজি (সা.) জানাজায় ইমামতি করলেন । জানাজা পড়ানোর পরদিন আবু কাতাদার সঙ্গে দেখা হতেই নবীজি (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ঋণটা কি শোধ করেছ? আবু কাতাদা বললেন যে, পাওনাদারের পুরো প্রাপ্য পরিশোধ করা হয়েছে । নবীজি (সা.) স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এখন সে শান্তি পাবে। বিখ্যাত সুফি সাধক হজরত জালাল উদ্দিন রুমি যখন মৃত্যুশয্যায় হঠাৎ তার মনে পড়ল, তার কাছে একজন ৫০ দিরহাম পাবে । ৫০ দিরহাম ঋণের কথা মনে পড়ায় ওই ৫০ দিরহাম সংগ্রহের চেষ্টা শুরু করলেন যে। এর মধ্যে যে পাবে সে পাওনাদার তারই ভক্ত। সে যখন শুনল যে, হুজুর অস্থির হয়ে গেছে সে-ও দৌড়ে আসল । জালাল উদ্দিন রুমিকে বলল যে, হুজুর আমার পাওনা নিয়ে আমার কোনো দাবি নাই, আমি এটা উপহার হিসেবে দিলাম। তখন রুমি শান্তির স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন যে, তুমি আমাকে বাঁচালে । আলহামদুলিল্লাহ ! একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া থেকে আমি বেঁচে গেলাম
হাদিসে কী আছে : দুর্দশাগ্রস্ত ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দিলে বা ঋণ মওকুফ করে দিলে আল্লাহ মহাবিচার দিবসে তার আরশের ছায়ায় তাকে আশ্রয় দান করবেন।- উসমান ইবনে আফফান (রা.), আবু কাতাদা (রা.), আবু হুরায়রা (রা.); তিরমিজি, আহমদ
ঋণ ভালোভাবে পরিশোধ করো। যে ভালোভাবে ঋণ পরিশোধ করে, সে-ই তোমাদের মধ্যে উত্তম।- আবু হুরায়রা (রা.); বোখারি, মুসলিম
ঋণ সম্পর্কে সাবধান! মহাবিচার দিবসে প্রত্যেকের ঋণই শোধ করতে হবে।- আবু হুরায়রা (রা.); মুসলিম অপরিশোধিত ঋণ ছাড়া শহিদের সকল গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেবেন।- আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.); মুসলিম
টাকা থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করবে না । এটা অন্যায়। আর কারো ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব যদি কোনো সক্ষম ব্যক্তি গ্রহণ করে, তবে তা মেনে নেবে।- আবু হুরায়রা (রা.); বোখারি, মুসলিম।
আল্লাহর পথে শহিদ হলেও ঋণ মাফ করা হবে না। এর শাস্তি ভোগ করতে হবে।- আবু কাতাদা হারিস ইবনে রিবি (রা.); মুসলিম ।
হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে সকল পাপ ও ঋণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। নবীজি (সা.) প্রায়ই এই দোয়া করতেন। একজন জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসুল! আপনি কেন প্রায়ই ঋণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে আল্লাহর আশ্রয় চান? তিনি জবাবে বললেন, ঋণগ্রস্ত হলে একজন মানুষ কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে ।- আয়েশা (রা); বোখারি ।
প্রতিটি বিলাসবহুল ভবন তার মালিকের জন্যে দুর্ভাগ্য বয়ে আনে।- আনাস ইবনে মালেক (রা.); আবু দাউদ, মেশকাত ।
মহাবিচার দিবসের কঠিন অবস্থা থেকে যে আল্লাহর সুরক্ষা চায়, সে যেন ঋণ পরিশোধে অক্ষম মানুষের ঋণ মওকুফ করে দেয় বা পরিশোধ করার মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়।- আবু কাতাদা (রা.); মুসলিম ।
শোধ করার আন্তরিক ইচ্ছা নিয়ে টাকা ধার করার পর সে যদি তা পরিশোধ করতে অক্ষম হয়, তবে আল্লাহ যে- কোনো উপায়ে ঋণ পরিশোধের পথ করে দেবেন। তবে প্রথম থেকেই যদি তার ঋণ শোধ করার কোনো ইচ্ছা না থাকে, এই বদ নিয়তের জন্য আল্লাহ তার সর্বনাশের পথ খুলে দেবেন।- আবু হুরায়রা (রা); বোখারি।
