একুশ শতাব্দী যেন প্রযুক্তির স্বর্ণযুগ। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট কিংবা স্মাটফোন এখন সবার হাতে। প্রতিটি ঘরে ঘরে এবং প্রায় প্রতিটি মানুষের জীবনেই প্রযুক্তি এখন অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঘরে বসেই কেনাকাটা থেকে শুরু করে গাড়ির টিকিট বুকিং করা যায়। সশরীরে না গিয়েও আমরা ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারি, ব্যবসায়ীরাও ঘরে বসে পুরো ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এমনকি হাসপাতালে না গিয়েও অনায়াসে পাচ্ছি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা।
এই শতকের ত্রিশের দশকে এসে প্রযুক্তি জগতে নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যার কল্যাণে চ্যাটজিপিটি, জেমিনির মতো উন্নতমানের চ্যাটবট সাধারণ মানুষের নাগালে চলে এসেছে। রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বহুজাতিক কোম্পানির সভাকক্ষ সবখানেই এআইÑ এর গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
আমরা শুধু আংশিকভাবে নয়, পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি প্রযুক্তির ওপর।
প্রশ্ন থেকেই যায়, প্রযুক্তির সংস্পর্শে আমরা আধুনিক হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের সৃজনশীলতাÑতা কি সত্যিই বাড়ছে, নাকি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে? শুধু প্রশ্নোত্তর নয়, অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশন তৈরির ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণভাবে এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে।
সম্প্র্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (গওঞ) মিডিয়া ল্যাব একটি গবেষণা চালায়। সেখানে ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ৫৪ জন অংশগ্রহণকারীকে তিনটি দলে ভাগ করে প্রবন্ধ লিখতে বলা হয়। প্রথম দল ব্যবহার করে চ্যাটজিপিটি, দ্বিতীয় দল গুগল সার্চ ইঞ্জিন, আর তৃতীয় দল কোনো প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়াই লেখে। গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পরিমাপের জন্য ঊঊে (ইলেক্ট্রোএনসেফ্যালোগ্রাম) মেশিন ব্যবহার করেন, যা মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ রেকর্ড করে। ফলাফলে দেখা যায়, চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীদের মস্তিষ্কে সবচেয়ে কম কার্যকলাপ পরিলক্ষিত হয়। স্নায়ুবিক, ভাষাগত ও আচরণগত দিক থেকেও তাদের অংশগ্রহণ ছিল দুর্বল। কয়েক মাস ধরে চলা এই গবেষণার শেষে দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীরা ধীরে ধীরে আরও অলস হয়ে পড়ছে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো প্রয়োজন ছাড়াই অনেকে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে মেতে থাকে। মানুষের মতো কথোপকথন করার ক্ষমতা থাকায় তারা এতে আনন্দ পায়, কিন্তু বুঝতে পারে না কত সময় অপচয় হচ্ছে। এই সময় যদি অন্য কাজে ব্যয় করত, তা অধিক ফলপ্রসূ হতো। অতিরিক্ত নির্ভরশীলতায় মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে অলস হয়ে পড়ে।
‘ডিউক ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ইনোভেশন’-এর গবেষক জিউন-টাইং ইয়েহ বলেন, দীর্ঘ সময় এআই ব্যবহারে মনোযোগ ও চিন্তার ধরনে পরিবর্তন আসে এবং কগনিটিভ ডেট তৈরি হয়Ñ অর্থাৎ মস্তিষ্ক নতুন তথ্য ধারণ ও বিশ্লেষণে দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটির সঙ্গে বেশি কথা বললে একাকিত্বের অনুভূতিও বাড়ে। অতএব এআই প্রযুক্তির সুবিধা ও অসুবিধা সম্পর্কে সচেতন হওয়া সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি। অন্ধভাবে নির্ভরশীল না হয়ে, এর ব্যবহার হতে হবে সচেতন, সীমিত ও প্রয়োজনমাফিক। প্রযুক্তি যেন আমাদের সহায়ক শক্তি হয়, নিয়ন্ত্রণকারী নয়Ñ এ বিষয়টি মাথায় রাখা আবশ্যক। সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এআই মানবজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে; অন্যথায় এটি সৃজনশীলতার অবক্ষয় এবং মানসিক সক্ষমতার হ্রাস ঘটাতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, যাতে তা আমাদের উন্নতির সোপান হয়, ধ্বংসের নয়।
নুসরাত জাহান আয়েশা
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Discussion about this post