জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : দীর্ঘ দুই দশকের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাককা খেয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার নেমে এসেছে ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে, যা ২০০৪ সালের পর সর্বনিম্ন। ওই বছর পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এ বছর পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১০ লাখ ৪৭ হাজার ২৪২ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পাস করেছেন ৫ লাখ ৯৮ হাজার ১৬৬ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার এ ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এবারের এ ফলাফলকে বিপর্যয় নয়, বরং বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বিগত সরকারের সময় ওভারমার্কিং বা বাড়তি নম্বর দিয়ে পাসের হার বেশি দেখানো হতো, এবার তা হয়নি।
ফলাফলে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। গত বছর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন। এবার সেই সংখ্যা ৬৯ হাজার ৯৭ জনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে ৭৬ হাজার ৮১৪ জন। গত বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৮৮টি অথচ এ বছর তা নেমে এসেছে মাত্র ৩৪৫টিতে। অন্যদিকে, এ বছর ২০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, যা গত বছরের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি।
ঢাকা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৬ হাজার ৬৩ জন, রাজশাহীতে ১০ হাজার ১৩৭ জন, কুমিল্লায় ২ হাজার ৭০৭ জন, যশোরে ৫ হাজার ৯৯৫ জন, চট্টগ্রামে ৬ হাজার ৯৭ জন, বরিশালে ১ হাজার ৬৭৪ জন, সিলেটে ১ হাজার ৬০২ জন, দিনাজপুরে ৬ হাজার ২৬০ জন, ময়মনসিংহে ২ হাজার ৬৮৪ জন, মাদরাসা বোর্ডে ৪ হাজার ২৬৮ জন এবং কারিগরিতে ১ হাজার ৬১০ জনসহ মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন।
ফলাফলে বরাবরের মতো এ বছরও এগিয়ে রয়েছেন ছাত্রীরা। মোট পাস এবং জিপিএ-৫-এর দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছেন তারা। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ছাত্রের চেয়ে ৮৭ হাজার ৮১৪ জন বেশি ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়েছেন। ছাত্রের চেয়ে ৫ হাজার ৯৭ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬১ জন অংশ নেন। উত্তীর্ণ হন ৭ লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন। ছাত্র উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৪ জন। ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬ জন। ছাত্রদের পাসের হার ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। ছাত্রীদের পাসের হার ৬২ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ৩২ হাজার ৫৩ জন ছাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছেন আর ৩৭ হাজার ৪৪ জন ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
ফলাফল ঘোষণার পর গতকাল সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি. আর. আবরার বলেন, আমরা অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে সন্তুষ্ট হইনি, ন্যায্য নম্বরে সততাকে বেছে নিয়েছি। এখন ভালো ফল না দেখিয়ে বাস্তবতাকে স্বীকার করার সময় এসেছে। তিনি স্বীকার করেন, দীর্ঘদিন ‘সংখ্যার সংস্কৃতি’ শেখার সংকটকে আড়াল করে রেখেছিল। তিনি বলেন, পাসের হারকেই আমরা সাফল্যের প্রতীক ভেবেছি। কিন্তু শেখার ঘাটতি ধরা পড়েনি। এখন সেই বাস্তবতা সামনে এসেছে।
শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, এ বছর খাতা মূল্যায়নে কোনো ওভারমার্কিং বা বাড়তি নম্বর দেয়া হয়নি। শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে নম্বর দিয়েছেন এবং মন্ত্রণালয় সেই বাস্তব ফল মেনে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে একটি ‘জাতীয় শিক্ষা পরামর্শ সভা’ আহ্বান করা হয়েছে। যেখানে শিক্ষক, অভিভাবক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ও প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন। পাশাপাশি বোর্ডগুলোর র?্যান্ডম অডিট ও পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশে আমরা কোনো বৈষম্য করিনি। কাউকে বিশেষ বিবেচনায় পাস করানো হয়নি। যে যা লিখেছে, ফলাফল তেমনই হয়েছে। তিনি জানান, এবার সবচেয়ে বেশি ফেল হয়েছে ইংরেজি বিষয়ে। এটি গত ২১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল।
তিনি বলেন, শতভাগ পাসের প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা পদপিষ্ট হচ্ছিল। এবার আমরা সেই প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসেছি। এবারের পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। এটাই আসলে ন্যায্য মূল্যায়ন। আমরা চাই, ভবিষ্যতেও এমন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া বজায় থাকুক।
ফলাফলের বৈষম্য প্রসঙ্গে, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী পাস করেনি, এটা কাক্সিক্ষত নয়। আমরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি অবশ্যই গলদ আছে। এখন সেই গলদের জায়গাগুলো ঠিক করতে হবে। তিনি মনে করেন, শিক্ষার এ বাস্তব চিত্রই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এ বছর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে এগিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। আর সবচেয়ে পিছিয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। আর কুমিল্লা বোর্ডে ৪৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন।
অন্যান্য বোর্ডের মধ্যে রাজশাহীতে ৫৯ দশমিক ৪০, যশোরে ৫০ দশমিক ২০, চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ৫৭, বরিশালে ৬২ দশমিক ৫৭, সিলেটে ৫১ দশমিক ৮৬, দিনাজপুরে ৫৭ দশমিক ৪৯ ও ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। অন্যদিকে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলতি বছরের আলিম পরীক্ষায় পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। এ বোর্ডে সারাদেশে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪ হাজার ২৬৮ জন।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এ বছর প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা ও নম্বর প্রদানে কঠোরতা ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে। তবে তারা এটিকে বিপর্যয় নয়, বাস্তবতার প্রতিফলন বলেই মনে করছে।
এ বছরের এইচএসসি ফলাফলে পাসের হার হ্রাস শুধু সংখ্যার গল্প নয়, এটি দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার মান নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। সরকার বলছে, এটাই শেখার প্রকৃত চিত্র আর সেই বাস্তবতা মেনে নিয়ে মানোন্নয়নের পথে এগোতে হবে।
