শেয়ার বিজ ডেস্ক : বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে সম্প্রতি হয়ে গেল পালাকার নাট্যদলের বহুল প্রশংসিত প্রযোজনা ‘ডাকঘর’-এর শততম প্রদর্শনী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কালজয়ী নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন শামীম সাগর। দীর্ঘ এক যুগ পর এই নাটক আবার মঞ্চে ফিরেছে, আর সেই ফিরে আসা যেন নতুন এক উচ্ছ্বাস ও গভীর ভাবনার জন্ম দিয়েছে দর্শকদের মনে।
নাটকটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর সরলতা, স্বাভাবিকতা এবং মঞ্চের প্রাণবন্ত গতি। পুরো প্রযোজনাজুড়ে ছিল না কোনো বাড়তি অলংকার বা কৃত্রিম আবেগের ভার; বরং ছিল এক ধরনের সহজিয়া সৌন্দর্য, যা দর্শকের মনে সরাসরি পৌঁছে গেছে। রবীন্দ্রনাথের নাটক বলতেই আমরা বুঝি যে একটা নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে একটা গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ একটা কিছু, কিন্তু শামীম সাগরের নির্দেশনায় ‘ডাকঘর’ সেই গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন এক মুক্তির নাট্যভাষা তৈরি করেছে।
অমল চরিত্রটি এই প্রযোজনায় এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে। মঞ্চের নানান কোণে অমলের পরিভ্রমণ, তাঁর কল্পনার জগতে ছুটে বেড়ানো, কখনও আকাশ ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষা– এসবের মাধ্যমে দর্শক অনুভব করেছে অমলের ভেতরকার স্বাধীনতার যাত্রা। নির্দেশক মঞ্চটিকে থ্রাস্ট আঙ্গিকে সাজিয়েছেন, তিন পাশে দর্শক এবং মাঝখানে অভিনয়ের পরিসর রেখে, যাতে করে অমল যেন প্রতিটি দর্শকের মুখোমুখি হতে পারে। এই বিন্যাসের কারণেই নাটকটি হয়ে উঠেছে দর্শকনির্ভর, যোগাযোগমুখী ও গভীরভাবে মানবিক।
চরিত্রায়নের ক্ষেত্রে ‘ডাকঘর’-এর এই প্রযোজনা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। অমল চরিত্রে ফেরদৌসী শর্মী ছিলেন প্রাণবন্ত, আন্তরিক ও বিশ্বাসযোগ্য। তাঁর সংলাপ প্রক্ষেপণ, দেহভঙ্গি, চোখের ভাষা সবকিছু মিলিয়ে অমলের সংবেদনশীল জগতটি মঞ্চে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে আমিনুর রহমান মুকুল, যিনি এক সঙ্গে ঠাকুরদা চরিত্রে অসাধারণ বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করেছেন, তাঁর অভিনয় নাটকের দর্শন ও ভাববিন্যাসকে আরও গভীর করেছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ঠাকুরদার একটি সংলাপ ‘ঘরে ধরে রাখাবার মতন খেলাও আমি জানি।’ এই সংলাপেই লুকিয়ে আছে পুরো নাটকের প্রতীকী সত্য। অমলের সঙ্গে ঠাকুরদার নানা রূপে গল্প করা– দইওয়ালা, প্রহরী, ফকির হয়ে আসা– আসলে তার ঘরে বন্দি অবস্থাকে টিকিয়ে রাখার সেই ‘খেলা’। নির্দেশক এই দার্শনিক স্তরটিকে নাট্যমাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অমল আসলে যাদের সঙ্গেই কথা বলে, তারা সবাই একই ব্যক্তি– সেই ঠাকুরদা, যিনি কখনও মমতাময়, কখনও নিয়ন্ত্রক, কখনও আবার অমলের অন্তর্জগতের প্রতিবিম্ব। কবিরাজ চরিত্রে চারু পিন্টু ছিলেন অনবদ্য– তাঁর কণ্ঠস্বর, শরীরী ভাষা ও উপস্থিতি দর্শকের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। মোড়ল চরিত্রের অভিনেতাও নিজ চরিত্রে ছিলেন আত্মবিশ্বাসী ও ভারসাম্যপূর্ণ। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, এই প্রযোজনার কাস্টিং ছিল যথাযথ এবং প্রত্যেক অভিনেতাই ছিলেন চরিত্রের প্রতি নিবেদিত।
আলোক পরিকল্পনা ও প্রক্ষেপণ ছিল যথাযথ; কোনো অতিরঞ্জন ছিল না; বরং সময়, আবহ ও মুডের পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই ঘটেছে। মঞ্চসজ্জা নিরাভরণ– রবীন্দ্রনের/ ‘রঙ্গমঞ্চ’ প্রবন্ধের ভাবনায় অনুপ্রাণিত। সামান্য সেট প্রোপার্টিস ব্যবহার এবং চারদিক থেকে দর্শকের মধ্য দিয়ে অভিনেতাদের প্রবেশ-প্রস্থান বিষয়টা তথাকথিত রবীন্দ্রনাট্যের উপস্থাপনার ঢঙের থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম হলেও চিত্তাকর্ষক।
তবে উন্নতির জায়গাও রয়ে গেছে। ছেলেদের কোরিওগ্রাফিতে আরও নিখুঁততা দরকার। সংগীত দল গান গেয়েছে ঠিকই, কিন্তু সংগীতের পাশাপাশি অভিনেতাদের অভিনয়ে মনোযোগ রাখা, ফ্যাসিয়াল এক্সপ্রেশনসহ এবং গানের ভাবসহ মুখের অভিব্যক্তি, শরীরের তাল, এগুলোর যুক্ততা আরও প্রয়োজন বলে মনে হয়েছে। সংগীত দলে এগুলোর অনুপস্থিতি ছিল বলে মাঝেমধ্যেই নাটকের মূলসুর থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে। পোশাক পরিকল্পনায়ও মনোযোগ বাড়ানো প্রয়োজন ছিল; বিশেষ করে প্রাইমারি রঙের আধিক্য কমিয়ে সেকেন্ডারি রঙের সঙ্গে মিশিয়ে ফতুয়ার পোশাক আরও দৃষ্টিনন্দন করা যেত।
সবশেষে বলা যায়, পালাকারের এই শততম প্রদর্শনী রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’-এর এক নতুন পাঠ, যেখানে মুক্তি, কল্পনা ও মানবিকতার অনন্ত বার্তা মঞ্চে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। শামীম সাগরের নির্দেশনা এই প্রজন্মের থিয়েটার অনুশীলনের জন্য এক দৃষ্টান্ত, যা প্রমাণ করে সরলতার মধ্যেই নিহিত থাকে নাট্যশিল্পের গভীরতম শক্তি।
এস এস/
