শেখ শাফায়াত হোসেন : বিদায়ী ২০২৫ সালে বেসরকারি খাতের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) নিট আমানত বেড়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। যা ব্যাংকটির জন্য কেবল একটি নতুন রেকর্ডই নয়, ব্যাংকটির আর্থিক চিত্র বদলে যাওয়ারও প্রমাণ বলে মনে করছে ইউসিবি কর্তৃৃপক্ষ।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইউসিবির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসে। আগের পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি বড় ধরনের অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে। দেশি-বিদেশি অনেক গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ফলে ব্যাংকটি ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে।
এ কারণে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটি থেকে বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলন করে নেয় বেশ কয়েকজন করপোরেট গ্রাহক। ফলে ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাহিদামতো নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) করতেও ব্যর্থ হয়।
তবে ২০২৫ সালে ব্যাংকটি শুধু তারল্যসংকট থেকে বেরিয়ে আসেনি, গ্রাহকের আস্থাও বেড়েছে ব্যাংকটির প্রতি।
নতুন পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নানা পদক্ষেপে ব্যাংকটি কয়েক মাসের মধ্যেই সেই সংকট কাটিয়ে উঠে। আমানতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধিও হয়।
ইউসিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত ২০২৫ সালে ব্যাংকটিতে নিট ১২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা আমানত প্রবৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে বছর শেষে ব্যাংকটির আমানতের স্থিতি দাঁড়ায় ৬৮ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা।
২০২৪ সালে ইউসিবির নিট আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল চার হাজার ৮২ কোটি টাকা।
জমা হওয়া নতুন আমানত থেকে আলোচিত সময়ের মধ্যে তুলে নেওয়া আমানত বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট আমানতকে নিট আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আলোচিত ২০২৫ সালে ইউসিবির নতুন হিসাব সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ লাখ ৭৮ হাজারে। ২০২৪ সালে নতুন হিসাব সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ১১ হাজার।
বিদায়ী ২০২৫ সালে ইউসিবির মাধ্যমে ৩৩০ কোটি ডলারের আমদানি বাণিজ্য সংঘটিত হয়। একই সময়ে রপ্তানি সংক্রান্ত লেনদেনও ছিল ৩৩০ কোটি ডলার।
ব্যাংকটি বর্তমানে ২৩৪টি শাখার মাধ্যমে দেশব্যাপী ব্যবসা করছে। উপশাখার সংখ্যা ১৮৭টি। ৬২০টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট রয়েছে ব্যাংকটির। এটিএম বুথের সংখ্যা ৭১৫টি।
ইউসিবি কর্তৃপক্ষ বলছে, ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন আমানত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।
ইউসিবির চেয়ারম্যান শরীফ জহীর শেয়ার বিজকে বলেন, ‘শক্তিশালী করপোরেট গভর্ন্যান্স, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে পরিচালিত একটি ব্যাংক হিসেবেই ইউসিবি আজ গ্রাহকের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই অর্জনের পেছনে ইউসিবির প্রতিটি কর্মীর নিষ্ঠা, দলগত প্রচেষ্টা এবং পূর্ণ অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গ্রাহকের অবিরাম ভরসা ও সমর্থন আমাদের এই আমানত প্রবৃদ্ধির মাইলফলকে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে।’
‘আমরা বিশ্বাস করি, এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ইউসিবি আগামী দিনগুলোতেও আরও শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে গ্রাহকের আস্থা ও আত্মবিশ্বাসকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই,’ যোগ করেন তিনি।
ইউসিবি সূত্র জানায়, ১৯৮৩ সালে ইউসিবি প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত ছিল ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আরামিট গ্রুপ, পারটেক্স গ্রুপ ও অনন্ত গ্রুপ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিন দশকের বেশি সময় প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তারা ঘুরেফিরে ব্যাংকটির নেতৃত্ব দেন। তখন পর্যন্ত ব্যাংকটিতে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়। ২০১৮ সালে পারটেক্স গ্রুপের প্রতিনিধিদের ইউসিবি ব্যাংক থেকে বের করে দিয়ে ব্যাংকটির পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয় আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরীর ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবার। সাইফুজ্জামান চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিমন্ত্রী হওয়ার পর ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তার স্ত্রী রুকমিলা জামান। এই সময়ে ব্যাংকটির ঋণে বড় ধরনের অনিয়ম ঘটে এবং সেসব নিয়ে এখনো তদন্ত করছে দুদক।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চেয়ারম্যান হিসেবে ব্যাংকটির দায়িত্ব নেন ব্যাংকটির অন্যতম উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শরীফ জহীর। এরপর ব্যাংকটির এমডি কানাডায় চলে গেলে নতুন এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ। তারা ব্যাংকটিকে সমস্যা থেকে বের করে এনে সামনে এগিয়ে নিতে নানা উদ্যোগ নেন। ফলে ব্যাংকটির নানা সূচকে উন্নতি ঘটে।
ইউসিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৮৩ শতাংশে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এডিআর ছিল ৯১ দশমিক ৩০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এডিআর ৮৭ শতাংশের মধ্যে রাখতে হয়। সেই হিসেবে ব্যাংকটির এডিআর এখন নির্দেশিত সীমার মধ্যে চলে এসেছে এবং আগের থেকে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ইউসিবির আমানতের পরিমাণ ছিল ৫৫ হাজার ৪২১ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ হাজার ৩১৭ কোটি টাকায়। সেই হিসেবে আমানতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ২৩ দশমিক ২৬ শতাংশ।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঋণ ছিল ৫৭ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, যা গত জুনে বেড়ে হয়েছে ৬০ হাজার ৮১৬ কোটি টাকায় উঠে আসে। তবে বছর শেষে ঋণ কমে ৫৭ হাজার কোটি টাকার ঘরে নেমে আসে।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post