চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ঘিরে এক দফা শ্রমিক আন্দোলন, সরকারি স্থগিতাদেশ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর আবারও উত্তাপ ছড়াচ্ছে বিদেশি অপারেটরের হাতে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা। তবে এবার শুধু এনসিটি নয়, এর পাশে থাকা চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) মিলিয়ে দুটি টার্মিনালকে একীভূত করে একক টার্মিনাল হিসেবে আধুনিকায়ন ও পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড।
গত ৮ এপ্রিল দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-দুবাই যৌথ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্ল্যাটফর্মের চতুর্থ সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এ আগ্রহ প্রকাশ করে কোম্পানিটি। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড একটি সংশোধিত ও বিস্তৃত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার টেবিলে ফিরেছে। এবার তাদের দাবি আরও বেশি। এর আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি শ্রমিক আন্দোলনের মুখে এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিতের ঘোষণা দেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন করে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ায় এখন আরও বড় পরিসরে বিনিয়োগ ও পরিচালনার প্রস্তাব দিল দুবাইভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী কোম্পানিটি।
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে তিনটি টার্মিনাল সক্রিয় রয়েছেÑজেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), সিসিটি এবং এনসিটি। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পর এই তিনটি টার্মিনাল এখনও দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তিনটির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এনসিটি। ৯৫০ মিটার দীর্ঘ এই টার্মিনালটি দেশের প্রধান কনটেইনার টার্মিনাল হিসেবে বিবেচিত। এখানে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী ও একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব। এনসিটির পাশেই অবস্থিত সিসিটিতে একসঙ্গে দুটি জাহাজ ভেড়ানো যায়। আর জিসিবিতে ছয়টি কনটেইনার জেটিতে পাঁচটি জাহাজের সুবিধা রয়েছে। এই তিন টার্মিনালের বাইরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লালদিয়ার চরে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় ডেনমার্কের মায়ের্সক লাইনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। টার্মিনালটি নির্মাণের পর চালু হবে, সে জন্য আরও বছর তিনেক অপেক্ষা করতে হবে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এনসিটি ১৫ বছর মেয়াদে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ছেড়ে দেওয়ার আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছিল। সে সময়ই সিসিটি পরিচালনার আগ্রহও প্রকাশ করেছিল ডিপি ওয়ার্ল্ড। কিন্তু তৎকালীন চলমান প্রক্রিয়ায় সিসিটির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় বন্দর কর্মকর্তারা তখন সেই আলোচনা এগিয়ে নেননি। শেষ পর্যন্ত এনসিটির ইজারা প্রক্রিয়াই ভেস্তে যায় শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিটি ইজারাপ্রক্রিয়া স্থগিতের ঘোষণা দেয়। বন্দর শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা করে আসছিলেন, বিদেশি অপারেটর এলে তাদের কর্মসংস্থান হুমকিতে পড়বে। সেই স্থগিতাদেশের মাত্র দুই মাসের মাথায় ৮ এপ্রিল দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম সভায় এনসিটির সঙ্গে সিসিটি পরিচালনার বিষয়টি আবারও তুলেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। এনসিটি ও সিসিটি পাশাপাশি অবস্থিত হওয়ায় দুটি টার্মিনালকে একীভূত করে একটি টার্মিনাল হিসেবে পরিচালনার প্রস্তাব দেয় তারা।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবের আগেই সিসিটি নিয়ে আরেকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি এমজিএইচ গ্রুপ গত ২৪ মার্চ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের কাছে সিসিটিতে বিনিয়োগ ও পরিচালনার প্রস্তাব জমা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি ২৫ থেকে ৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগে টার্মিনালটি দীর্ঘ মেয়াদে পরিচালনার পরিকল্পনা দিয়েছিল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায়। তবে বন্দর সূত্রে জানা গেছে, এই প্রস্তাব খুব একটা এগোয়নি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশীয় কোম্পানির তুলনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক পরিচালনা অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ সক্ষমতা সরকারের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বিশ্বের ৭৮টিরও বেশি বন্দরে কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের।
দুবাইয়ের সভায় ডিপি ওয়ার্ল্ড শুধু সিসিটি যুক্ত করার প্রস্তাবই দেয়নি, বেশ কিছু শর্তও তুলে ধরেছে। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, এনসিটি পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজস্ব, ব্যয় ও জনবলকাঠামো নিয়ে আরও বেশি স্বচ্ছতা চেয়েছে কোম্পানিটি। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত ১৫ বছরের কনসেশন মেয়াদ পুনর্বিবেচনা করতে বলেছে তারা। টার্মিনাল আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পরিমাণ নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দিয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, এনসিটির জন্য আরএফপির (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল) মেয়াদের মধ্যেই সব আলোচনা শেষ করতে হবে এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডকে প্রয়োজনে একটি সংশোধিত দরপত্র প্রস্তাব দ্রুততম সময়ে জমা দিতে হবে। শুধু এনসিটি ও সিসিটিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না ডিপি ওয়ার্ল্ড। প্রায় সাত বছর আগে কোম্পানিটি বাংলাদেশের লজিস্টিকস অবকাঠামো উন্নয়নে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। সর্বশেষ সভায় সেই প্রস্তাবে নতুন প্রকল্প যুক্ত করা হয়েছে।
সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বে কনটেইনার টার্মিনাল, ধীরাশ্রম আইসিডি এবং ডিজিটাল সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেমÑ এই তিনটি অবকাঠামো প্রকল্পেও বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। বিশেষ করে বন্দরের কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার আধুনিকায়নে যৌথভাবে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে তারা। এর পাশাপাশি নিমতলা ডিপোতেও বিনিয়োগে আগ্রহের কথা জানিয়েছে দুবাইভিত্তিক কোম্পানিটি।
দুবাইয়ের সভায় বাংলাদেশ পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরীসহ চারজন কর্মকর্তা অংশ নেন। দুবাই সরকারের পোর্টস, কাস্টমস অ্যান্ড ফ্রি জোনস করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের আবদুল্লাহ আল নেয়াদি এবং ডিপি ওয়ার্ল্ড গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা যুবরাজ নারায়ণসহ চারজন অংশ নেন। তবে এত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পরেও বাংলাদেশ পক্ষের শীর্ষ কর্তার কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আশিক চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনে এসে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, এনসিটি ইজারার ক্ষেত্রে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবে ইতিবাচক সম্ভাবনা থাকলেও কিছু চ্যালেঞ্জও আছে বলে স্বীকার করেছেন তিনি এবং জোর দিয়েছেন সতর্ক পর্যালোচনার ওপর। সরকারের এ সতর্কতার পেছনে রয়েছে বন্দর শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের আপত্তি। এনসিটির মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়া হলে হাজারো শ্রমিকের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়তে পারেÑএই আশঙ্কা এখনও রয়েছে। এখন সিসিটিও প্রস্তাবে যুক্ত হওয়ায় সেই আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দীর্ঘদিনের। কিন্তু বন্দরের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অটোমেশনের অভাব এবং কম উৎপাদনশীলতার কারণে সেই লক্ষ্য এখনও অধরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো বৈশ্বিক অপারেটর এলে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের সঙ্গে সংযোগ বাড়তে পারে। তবে অন্যদিকের যুক্তিও কম জোরালো নয়। টার্মিনাল পরিচালনার রাজস্ব দীর্ঘ মেয়াদে বিদেশি কোম্পানির ঘরে চলে গেলে জাতীয় অর্থনীতি কতটা লাভবান হবে, সেই হিসাব এখনও স্পষ্ট নয়। কনসেশন মেয়াদ, রাজস্ব ভাগাভাগির হার এবং জনবলনীতিÑএই তিনটি বিষয়ে চুক্তির শর্ত কেমন হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে পুরো প্রশ্নের উত্তর। পরবর্তী পিপিপি প্ল্যাটফর্ম সভায় সিসিটি প্রস্তাবটি পৃথক প্রকল্প হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবেচনায় আসবে। তার আগেই ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সংশোধিত দরপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। আপাতত তাই অপেক্ষায় বন্দরনগর চট্টগ্রামের সবচেয়ে মূল্যবান দুটি টার্মিনালের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে।

Print Date & Time : 14 May 2026 Thursday 4:00 am
এবার এনসিটির সঙ্গে সিসিটি ইজারা চায় ডিপি ওয়ার্ল্ড
শীর্ষ খবর ♦ প্রকাশ: